ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ১ বৈশাখ ১৪৩৩
Daily Global News

তেলের লাইনে অস্থিরতা: মনস্তাত্ত্বিক সংকট নাকি সামাজিক বৈকল্যের প্রতিচ্ছবি?

ওমর ফারুক

প্রকাশিত: এপ্রিল ২, ২০২৬, ০২:৩৬ পিএম

তেলের লাইনে অস্থিরতা: মনস্তাত্ত্বিক সংকট নাকি সামাজিক বৈকল্যের প্রতিচ্ছবি?

গত এক মাস ধরে বাংলাদেশের ফিলিং স্টেশনগুলোর চিরচেনা দৃশ্য বদলে গেছে। যে মোড়ে আগে গাড়ির চাকা অনায়াসে ঘুরত, সেখানে এখন শত শত মোটরসাইকেল আর কারের নিথর দীর্ঘ সারি। মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে চলা ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের জের ধরে তেলের বাজারে যে অস্থিরতা শুরু হয়েছে, তার প্রভাব কেবল অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন রূপ নিয়েছে এক গভীর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকটে। পাম্পে তেল না পেয়ে ম্যানেজারকে ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যা, বাঁশঝাড়ের নিচে তেলের মজুত, কিংবা বাইসাইকেলে মোটরসাইকেলের ট্যাংকি বেঁধে তেল সংগ্রহের মতো যেসব ঘটনা আমরা দেখছি, তা আমাদের সামগ্রিক আচরণগত অস্থিরতাকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।

সরকারের পক্ষ থেকে বারবার আশ্বস্ত করা হচ্ছে যে, দেশে তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। বিদ্যুৎমন্ত্রী থেকে শুরু করে জ্বালানি বিভাগের সচিব সবাই একবাক্যে বলছেন, সংকটের চেয়ে ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত কেনাই এই দীর্ঘ লাইনের মূল কারণ। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে যুদ্ধের যে ভীতি জেঁকে বসেছে, তা কেবল আশ্বাসের বাণীতে দূর হচ্ছে না। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী যথার্থই বলেছেন, এই সংকট অনেকটাই ‘মনস্তাত্ত্বিক’। মানুষ ভাবছে আজ না কিনলে কাল হয়তো আর পাওয়া যাবে না। আর এই সুযোগটিই নিচ্ছে একদল অসাধু মজুতদার।

তাজ্জব করা বিষয় হলো, তেলের জন্য হাহাকার কেবল রাজপথেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি ছড়িয়ে পড়েছে লোকালয়ে। নাটোরে বাঁশঝাড়ের নিচে মাটির ট্যাংকে ১০ হাজার লিটার তেল লুকিয়ে রাখা কিংবা ময়মনসিংহে মুদি দোকানির বাড়িতে তেলের ড্রাম পাওয়া এগুলো প্রমাণ করে যে লাভের লোভ মানুষকে কতটা অন্ধ করে দিয়েছে। আবার অন্যদিকে গাইবান্ধার সেই বাচ্চু মিয়ার কথা ধরা যাক, যিনি বাইসাইকেলে বাইকের ট্যাংকি বেঁধে তেল নিতে এসেছেন। এটি যেমন একধারে হাস্যরস তৈরি করেছে, অন্যদিকে প্রকাশ করেছে সাধারণ মানুষের চরম অসহায়ত্ব ও জেদ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সমাজ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক এই পরিস্থিতিকে ‘সামাজিক বৈকল্যের বহিঃপ্রকাশ’ বলে অভিহিত করেছেন। যখন কোনো সংকটে সঠিক ব্যবস্থাপনা ও জনআস্থার অভাব দেখা দেয়, তখন মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেয় কিংবা নীতি-নৈতিকতা ভুলে একে অন্যকে দোষারোপ করতে শুরু করে।

নড়াইলে পাম্প ম্যানেজারকে ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যার ঘটনাটি সেই চরম অস্থিরতারই এক নৃশংস উদাহরণ। তেল নামক এই ‘তরল সোনা’র জন্য মানুষ এখন মানুষের প্রাণ নিতেও দ্বিধা করছে না।

সরকার পরিস্থিতি সামলাতে ‘ফুয়েল কার্ড’ এবং ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগের মতো প্রশাসনিক উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু সেই কার্ড সংগ্রহ করতে গিয়ে হুড়োহুড়ি আর মারামারির ঘটনাও আমাদের পিছু ছাড়ছে না। চুয়াডাঙ্গায় কার্ড নিতে এসে একজনের মৃত্যু কিংবা লালমনিরহাটে তেলের লাইনে কাদামাটি মাখামাখি হয়ে মারামারি এগুলো কোনো সভ্য সমাজের চিত্র হতে পারে না। প্রশ্ন উঠছে, আমাদের ব্যবস্থাপনা কি তবে যথেষ্ট নয়? নাকি মানুষের ধৈর্য একেবারেই নিঃশেষ হয়ে গেছে?

আসলে এই সংকটের মূলে রয়েছে আস্থার সংকট। বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলার ছোঁয়া কিংবা হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা পড়ার খবর মানুষকে বিচলিত করছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত কেনা বা মজুত করা সমস্যার সমাধান নয়, বরং এটি সংকটকে আরও ঘনীভূত করে। যে অকটেন বা পেট্রোল আপনি আজ ড্রামে ভরে ঘরে রাখছেন, তা হয়তো অন্য কোনো জরুরি সেবার গাড়ির জন্য প্রয়োজন ছিল।

যুদ্ধের প্রভাব আমাদের হাতে নেই, কিন্তু আমাদের নিজেদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ অবশ্যই আছে। প্রশাসনের কড়া নজরদারি যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন নাগরিক সচেতনতা। পাম্পগুলোতে ট্যাগ অফিসারের পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষার প্রসারও জরুরি। তা না হলে এই তেলের লাইন কেবল সড়ক নয়, আমাদের মানবিকতাকেও পিষ্ট করে দেবে। যুদ্ধের বারুদ মধ্যপ্রাচ্যে পুড়লেও তার ধোঁয়ায় আমাদের সামাজিক বন্ধন যেন ফিকে না হয়ে যায়, সেটাই এখন বড় প্রার্থনা।

ওমর ফারুক, গণমাধ্যমকর্মী।

ডিজিএন/এফএ

banner
Link copied!