বাঙালির পঞ্জিকায় এমন কিছু দিন থাকে, যা কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়; যা মিশে আছে আমাদের অস্তিত্বের প্রতিটি ধমনীতে। তেমনই এক দিন অমর একুশে ফেব্রুয়ারি। ১৯৫২ সালের সেই ফাল্গুনি দিনে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারের রক্তে। আজ ৭৪ বছর পেরিয়ে এসেও সেই রক্তের দাগ মুছে যায়নি; বরং তা হয়ে উঠেছে আমাদের আত্মপরিচয়ের অবিনাশী বাতিঘর।
১৯৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারি কেবল একটি ভাষা রক্ষার আন্দোলন ছিল না, তা ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ দ্রোহ। পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী যখন আমাদের মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল, তখন ছাত্র-জনতা বুকের রক্ত দিয়ে প্রমাণ করেছিল অস্তিত্বের ওপর আঘাত বাঙালি কখনো সইবে না। একুশের সেই চেতনার ধারাবাহিকতাতেই আমরা পেয়েছি ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার বিপ্লব। একুশ আমাদের শিখিয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছা আর সত্যের পথে থাকলে কোনো স্বৈরাচারই টিকে থাকতে পারে না।
একুশে ফেব্রুয়ারি আজ কেবল বাঙালির নয়, তা পুরো বিশ্বের। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কোর স্বীকৃতির পর ২০০০ সাল থেকে সারা বিশ্বে এটি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালিত হচ্ছে। এটি পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল এক সম্মান। যেখানেই কোনো ভাষা বা সংস্কৃতি হুমকির মুখে পড়বে, সেখানেই একুশের চেতনা অনুপ্রেরণা দেবে। একুশ আমাদের শেখায় নিজের ভাষাকে ভালোবাসার পাশাপাশি অন্যের মাতৃভাষার প্রতিও শ্রদ্ধাশীল হতে।
২০২৬ সালে এসে একুশের চেতনাকে আমাদের নতুনভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। আমরা কি পেরেছি সর্বস্তরে বাংলা ভাষার সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে? আমাদের আদালত, বিজ্ঞানচর্চা আর উচ্চশিক্ষায় বাংলা এখনো কতটা ব্রাত্য? তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে বাংলা ভাষাকে বৈশ্বিক ডাটাবেজে শক্তিশালী অবস্থানে নেওয়া এখন সময়ের দাবি। শুধু আবেগ দিয়ে নয়, বরং বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মাধ্যমে বাংলাকে বিশ্ব দরবারে সমৃদ্ধ করতে হবে।
একুশে ফেব্রুয়ারি মানে কেবল প্রভাতফেরি, শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ আর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গানটি গাওয়া নয়। একুশ মানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া, বৈষম্যহীন সমাজ গড়া এবং নিজের সংস্কৃতিকে হৃদয়ে ধারণ করে বিশ্বনাগরিক হওয়া। আসুন, এবারের অমর একুশে আমরা শপথ নিই, যে ভাষার জন্য আমাদের পূর্বসূরিরা রক্ত দিয়েছেন, সেই ভাষার মর্যাদা রক্ষায় আমরা দেশ ও দশের কল্যাণে নিবেদিত থাকব।
শহীদরা অমর, তাঁদের রক্ত বৃথা যেতে পারে না। জয় হোক বাংলা ভাষার, জয় হোক বাঙালির অদম্য স্পৃহার।
ওমর ফারুক, গণমাধ্যমকর্মী


আপনার মতামত লিখুন :