ঢাকা শনিবার, ৩০ মে, ২০২৬, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
Daily Global News

খাল খনন থেকে সার্ক- এক ক্ষণজন্মা রাষ্ট্রনায়কের স্বপ্ন, কঠোরতা ও বিতর্ক

ওমর ফারুক

প্রকাশিত: মে ৩০, ২০২৬, ০৯:৫৫ এএম

খাল খনন থেকে সার্ক- এক ক্ষণজন্মা রাষ্ট্রনায়কের স্বপ্ন, কঠোরতা ও বিতর্ক

তিনি ছিলেন এক ক্লান্তিহীন অভিযাত্রী-একজন মানুষ যিনি একাত্তরের কালরাত্রির কণ্ঠস্বরকে ঘুণপাক থেকে জেগে ওঠা প্রতিরোধে পরিণত করতে পেরেছিলেন। স্বাধীনতার শপথ নেওয়ার পর লাঠি-পিঠে অক্ষত সেই প্রত্যয় নিয়ে তিনি ছুটে বেড়ালেন টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, গ্রাম-গঞ্জ থেকে শহরের বিহ্বল প্রান্তে; চোখে একটা শুধু স্বপ্ন-ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত, স্বনির্ভর ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়া। সেই মানুষের নাম-জিয়াউর রহমান।

১৯৭৭ সালের এপ্রিলে রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণের পর মাত্র সাড়ে তিন বছরের সংক্ষিপ্ত শাসনামলেই তিনি একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত, তহবিলহীন ও আস্থা-হীন বাংলাদেশকে দৃঢ়তা ও সম্ভাবনার গতিপথে ফেরাতে সক্ষম হন। অর্থনীতি ও রাজনৈতিক সংস্কারের যে মিশ্রণগুলো তিনি অনুসরণ করেছিলেন, সেগুলো আজকের বাংলাদেশের কিছু মূল ভিত্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। ৩০ মে-আজ তাঁর ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী এক যুগান্তকারী রাজনীতিকের জীবন পর্যালোচনার উপযুক্ত মুহূর্ত। ১৯৮১ সালের এই দিনে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে কিছু বিপথগামী সেনাসদস্যের নির্মম বুলেটের আঘাতে থমকে গিয়েছিল লাল-সবুজের পতাকাকে বিশ্বমঞ্চে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া এক স্বপ্নের যাত্রা।

অর্থনৈতিক বিপ্লব, ভূমিকা ও কর্মসূচি:- জিয়া বুঝেছিলেন স্বাধীনতা বজায় রাখতে হলে অর্থনৈতিক স্বাবলম্ব্য অপরিহার্য। তাই তিনি কৃষিখাতকে অগ্রাধিকার দিলেন। ‍‍`খাল খনন কর্মসূচি‍‍`র মাধ্যমে নদীর পানিকে সরাসরি চাষীর জমিতে পৌঁছে দেওয়া হয়, রোপণ ও সেচ ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে শস্য উৎপাদনে নাটকীয় উন্নতি ঘটাতে সহায়তা করে। এই উদ্যোগ দেশের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথ সুগম করে এবং পরবর্তীতে রপ্তানিযোগ্য অন্ন উৎপাদনের ভিত্তি তৈরি করে।

সুতরাং গার্মেন্টস হাতে রেখেছিলেন, রেমিট্যান্সের সূচনা ঘটিয়েছিলেন: বিদেশী মুদ্রা অর্জনে তিনি প্রবাসী কর্মশক্তির নিয়মিত প্রস্থান ও রপ্তানির জন্য সরকারি প্রক্রিয়া শুরু করেন। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে তৈরি পোশাক শিল্পে লাইসেন্স ও প্রণোদনা দিয়ে সেটিকে উৎসাহিতা করেন, যার সুফল আজকের বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দুটি বড় চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতীয়মান: রেমিট্যান্স ও রপ্তানি-ভিত্তিক তৈরি পোশাক শিল্প।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, জনগণের ঘরে সেবা পৌঁছে দেওয়া:- তার শাসনামলে গণশিক্ষা ও গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্ব দেয়া হয়। ‍‍`পল্লী চিকিৎসক‍‍` ও থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মাধ্যমে গ্রামীণ মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়া শুরু হয়, আর স্বাক্ষরতার হার বাড়ে এক সমানতাবোধক রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের নিদর্শন।

বাকশাল অবসান ও বহুদলীয় গণতন্ত্র: রাজনৈতিক ক্ষেত্রে জিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল বাকশাল অবসান একদলীয় শাসন ব্যবস্থা ভাঙা এবং সংবাদপত্র-রাজনৈতিক দলের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনা। তিনি বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পুনরুদ্ধারে এগিয়ে এলে রাজনৈতিক ফিরিস্তায় বৈচিত্র্য ফিরে আসে। ১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ছিল সেই সময়ের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নতুন এক সংগঠিত শক্তি, যা টেকনোক্র্যাট, বুদ্ধিজীবী ও তৃণমূল কর্মীর সমন্বয় ঘটায়।

স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও সার্কের সূচনা:- জিয়া পররাষ্ট্রনীতিতে ছিলেন পরিমিত ও স্বাধীনতাবাদী-‍‍`সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়‍‍`-এই নীতিই তাঁর কূটনৈতিক কর্মসূচির মূল ছিল। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে মধ্যক্রান্তীয় সম্পর্ক উন্নয়ন, বিদেশি কর্মসংস্থানের বাজার সৃষ্টি এবং জাতিসংঘে যুদ্ধবিরতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় মধ্যস্থতার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদা বাড়ান। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সংহতি গঠনে তিনি সার্ক (SAARC) প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রাখেন-যার মাধ্যমে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক কূটনীতিতে নেতৃত্ব দানের ভূমিকায় নিয়ে আসা সম্ভব হয়।

নৈতিকতা ও ব্যক্তিত্ব, ক্ষমতার চূড়ায় থেকেও সততা:- জিয়ার ব্যক্তিত্বের আরেকটি তরফ ছিল তার সরলতা ও নৈতিকতা। বর্তমান সংসদ স্পিকার বীর মুক্তিযোদ্ধা হাফিজ উদ্দিন আহমদের কথায়, জিয়া ক্ষমতার শীর্ষবিন্দুতে থেকেও দুর্নীতি বা স্বজনপ্রীতিতে আকৃষ্ট হননি। ব্যক্তিগত দাপট বা সমৃদ্ধি না-হওয়া-তার ছেঁড়া গেঞ্জি, সোজা-সরল জীবনযাপন এবং কোনো বড় সম্পদের অভাব এই সবই ছিলেন জনমানসে তাঁর প্রতি দীর্ঘস্থায়ী ভরসার কারণ। মানুষের সেই বিশ্বাসই লাখো মানুষের ঢল-তাঁর জানাজায় উদ্ভাসিত হয়েছিল।

এক ক্ষণজন্মা নেতৃত্বের রাজনৈতিক নির্দেশনা:- তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের যে অভাবটি দেখা দেয়, সেটি কেবল একজন ব্যক্তির শূন্যস্থান নয় একটি রাজনৈতিক দর্শন ও প্রাতিষ্ঠানিক পাঠের অভাবও ছিল। হাফিজ উদ্দিন আহমদের কথায়, যদি পরবর্তী সরকারগুলো জিয়ার অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখত, বাংলাদেশ আজকের চেয়েও দ্রুত উন্নত গতি ধরতে পেত। এটি শুধু অতীতের রোমানচিক নয়; এটি এক বাস্তব চিন্তা-কিভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা ও রাজনৈতিক স্থিতি একসাথে দেশের বৃহত্তর কল্যাণে রূপ নিতে পারে।

সমালোচনা ও জিজ্ঞাসা, চিরন্তন প্রশ্নগুলো:- তবে প্রতিটি রাষ্ট্রনায়কের নায়কত্বে ছাপিয়ে থাকা ছায়া থেকেই যায়। চোরা-পথে ক্ষমতা আহরণ, তৎকালীন সেনা-রাজনীতির উদ্বেগ-এসব প্রশ্ন আজও ইতিহাসবিদ ও সমালোচকের কাছে উন্মুক্ত। আমরা কি শুধু নীতির সুফলগুলোই গণনা করবো, নাকি সেই নীতির জন্মের প্রেক্ষাপট ও সামাজিক মূল্যায়নও বিবেচ্য করবো? গণতন্ত্র স্থাপনের প্রচেষ্টায় সামরিক উপস্থিতি কতটুকু সমর্থনযোগ্য—এ প্রশ্নটিও থাকতে হবে ইতিহাসের ভাবনায়।

জিয়াউর রহমানের জীবন ও কর্ম আমাদের শেখায় কতটা গুরুত্বপূর্ণ একটি স্বচ্ছ, কার্যকর ও দারিদ্র্য বিমোচনমুখী নীতিগত দিক নির্ধারণ। স্বাধীনতার কষ্টার্জিত অর্জনকে টনক নড়ানো থেকে রক্ষায় অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতি কতটা শক্তভাবে ভূমিকা রাখতে পারে, তা তিনি প্রমাণ করেছেন। একই সঙ্গে তার ব্যক্তিগত চরিত্র, দেশপ্রেম এবং পররাষ্ট্রনীতি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি চিরস্থায়ী অধ্যায় রেখে গেছে।

আজকের এই দিনে স্মরণ করা উচিত শুধুমাত্র অতীতের গৌরব নয়, বরং সেই স্মৃতিকে করে তোলা বাস্তব নীতিতে রূপান্তর যা আগামী প্রজন্মকে দারিদ্র্যহীন, নিরাপদ ও মর্যাদাসম্পন্ন ভবিষ্যত দিতে সক্ষম হবে। রাজনীতির চাকা ঘোরানো-অথবা সার্ক গঠন-যে দুটিই হোক না কেন, প্রয়োজন সৎ নেতৃত্ব, রদবদলহীন নীতি ও জনগণের মধ্যে আন্তরিক বিশ্বাস; এবং সময়ে সময়ে সেই পাঠগুলোই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে, যখন আমরা জাতির ইতিহাসকে অনুধাবন করতে চাই।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।

 

ডেইলি গ্লোবাল নিউজ

banner
Link copied!