মধ্যপ্রাচ্য আজ এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি, যার লাভা ছড়িয়ে পড়ছে সীমান্ত ছাড়িয়ে বহুদূর। গত শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় পাল্টে দিয়েছে এই অঞ্চলের কয়েক দশকের চেনা ভূ-রাজনীতি। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রয়াণ এবং তার পুরো পরিবারের নিশ্চিহ্ন হওয়া কেবল একটি শাসনামলের অবসান নয়, বরং এক নতুন ও রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের সূচনা।
ইরানের ইতিহাসের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিত্বকে হারানোর পর তেহরান এখন ক্ষোভে ফুঁসছে। খামেনির স্ত্রী, সন্তান ও নাতি-নাতনিদের মৃত্যু ইরানকে এমন এক জায়গায় দাঁড় করিয়েছে, যেখান থেকে ফিরে আসার পথ নেই বললেই চলে। আইআরজিসি তাদের সর্বোচ্চ প্রযুক্তি ‘খাইবার’ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সরাসরি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও বিমানবাহিনীর সদর দপ্তরে আঘাত হেনে বুঝিয়ে দিয়েছে তারা কোণঠাসা হলেও পরাজিত নয়।
এতদিন হিজবুল্লাহ বা হুথিদের মাধ্যমে ইরান যে ‘ছায়া যুদ্ধ’ চালিয়ে আসত, আজ তা সরাসরি লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। লেবাননের রাজধানী বৈরুত আজ ধ্বংসস্তূপ, দক্ষিণ লেবাননের ৫৩টি গ্রামের মানুষ আজ উদ্বাস্তু। গাজার সেই পরিচিত ভয়াবহ দৃশ্যগুলো এখন লেবাননের রাজপথে প্রতিফলিত হচ্ছে।
এই যুদ্ধের আঁচ লেগেছে সাধারণ মানুষের পকেটেও। কাতারের গ্যাস উৎপাদন বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে স্থবিরতা বিশ্ববাজারে তেলের দাম এক লাফে ১০ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে। ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে শত শত প্রবাসীর আহাজারি মনে করিয়ে দিচ্ছে, যুদ্ধ কেবল সীমান্তে হয় না, এর প্রভাব পড়ে সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারের সাধারণ মানুষের জীবনেও। আমাদের ২ জন রেমিট্যান্স যোদ্ধা ইতিমধ্যে এই আগুনের বলি হয়েছেন।
পর্দার আড়ালে সৌদি যুবরাজের চাপের খবর বা যুক্তরাজ্যের সরাসরি অংশীদারিত্ব সব মিলিয়ে এক জটিল কূটনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। একদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ৫ সপ্তাহের ‘মিশন’ শেষ করার হুঙ্কার, অন্যদিকে পুতিনের কাতারের আমিরের পাশে দাঁড়ানো সবই ইঙ্গিত দিচ্ছে এক বৃহত্তর মেরুকরণের।
যুদ্ধ কখনো শান্তি আনে না, আনে শুধু ধ্বংস আর লাশের মিছিল। আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যু বা ১৮০ জন স্কুলছাত্রীর রক্ত ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করবে না। বিশ্বনেতারা যদি এখনই সংঘাত না থামান, তবে ২০২৬ সালটি মানব ইতিহাসের পাতায় একটি ‘কালো বছর’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। মধ্যপ্রাচ্যের এই আগুন যদি বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেয়, তবে জয়ী হওয়ার জন্য কেউ অবশিষ্ট থাকবে না।
ওমর ফারুক, গণমাধ্যমকর্মী


আপনার মতামত লিখুন :