ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ, ২০২৬, ২১ ফাল্গুন ১৪৩২
Daily Global News

সীতাকুণ্ডের সেই কাটা শ্বাসনালী এবং আমাদের বোবা বিবেক

ওমর ফারুক

প্রকাশিত: মার্চ ৩, ২০২৬, ১০:০১ পিএম

সীতাকুণ্ডের সেই কাটা শ্বাসনালী এবং আমাদের বোবা বিবেক

সীতাকুণ্ডের দুর্গম পাহাড়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় এক হাজার ফুট উঁচু। সেই নির্জন অরণ্যে চিরুনি চালালে হয়তো পাওয়া যাবে বুনো ফুল, ঝরনার গান কিংবা পাহাড়ের নিস্তব্ধতা। কিন্তু গত রোববার (১ মার্চ) সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে গিয়েছিল এক শিশুর গোঙানিতে। আট বছরের এক শিশু, নাম জান্নাতুল নিসা ইরা। তার অপরাধ ছিল কী? হয়তো কিছুই না। কিন্তু ঘাতক বাবু শেখের লালসার সামনে তার ছোট প্রাণটি ছিল কেবল এক লক্ষ্যবস্তু।

সীতাকুণ্ড ইকোপার্ক থেকে চন্দ্রনাথ মন্দিরে যাওয়ার দুর্গম পথে রাস্তা সংস্কারের কাজ করছিলেন শ্রমিকরা। তারা যা দেখলেন, তা কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ কল্পনা করতে পারে না। একটি ছোট্ট শিশু, যার গলা থেকে অনবরত রক্ত ঝরছে, শ্বাসনালী কাটা সেই শিশুটি টলমল পায়ে হেঁটে পাহাড় থেকে নেমে আসছে। কথা বলতে পারছে না, কিন্তু তার চোখগুলো চিৎকার করে বলছিল ‘আমি বাঁচতে চাই’। শ্রমিকরা তাদের গায়ের কাপড় দিয়ে তার গলা পেঁচিয়ে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই ভিডিও যখন ফেসবুকে ভাইরাল হলো, আমরা সবাই শিউরে উঠলাম। কিন্তু হায়! আজ ৩ মার্চ ভোররাতে সেই লড়াকু প্রাণটি চমেক হাসপাতালের আইসিইউতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল।

তদন্তে বেরিয়ে এসেছে এক ভয়ংকর সত্য। ঘাতক বাবু শেখ তাকে ফুসলিয়ে বাড়ি থেকে প্রায় ১০-১৪ কিলোমিটার দূরের সেই নির্জন পাহাড়ে নিয়ে যায়। সেখানে নিজের পাশবিক লালসা চরিতার্থ করার পর প্রমাণ লোপাট করতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে শিশুটির গলা কেটে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। ঘাতক ভেবেছিল নির্জন পাহাড়ে বন্যপ্রাণীরা ইরাকে খেয়ে ফেলবে, কোনো প্রমাণ থাকবে না। কিন্তু ইরা লড়েছিল। কাটা গলা নিয়ে সে নেমে এসেছিল সভ্যতার খোঁজে।

ইরার এই মৃত্যু কেবল একটি সাধারণ অপরাধ নয়, এটি আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের এক চূড়ান্ত নিদর্শন।

নিরাপত্তার অভাব: সীতাকুণ্ড ইকোপার্কের মতো একটি সংরক্ষিত এলাকায় কীভাবে দিনের আলোতে এমন ভয়াবহ ঘটনা ঘটতে পারে? সেখানে পর্যটক ও স্থানীয়দের নিরাপত্তা কোথায়?

পরিচিতের বিশ্বাসঘাতকতা: গ্রেফতারকৃত আসামি বাবু শেখ শিশুটির পূর্বপরিচিত। আমরা এখন আমাদের সন্তানদের কার কাছে নিরাপদ মনে করব?

শিশুর আর্তনাদ: ইরা ইশারায় খুনিকে চিনিয়ে দিতে চেয়েছিল। সে পানি খেতে চেয়েছিল মৃত্যুর আগে, কিন্তু কাটা শ্বাসনালীর কারণে চিকিৎসকরা তাকে পানিটুকুও দিতে পারেননি। এই যে তৃষ্ণা আর যন্ত্রণা নিয়ে একটি শিশু বিদায় নিল, তার দায়ভার কার?

ইরা মরে গিয়ে বেঁচে গেছে। এই কলুষিত সমাজ, যেখানে আট বছরের শিশুকেও ধর্ষণের শিকার হতে হয়, সেই সমাজ হয়তো ইরার যোগ্য ছিল না। কিন্তু আমরা যারা বেঁচে আছি, আমাদের দায় শেষ হয়নি। পুলিশ ঘাতক বাবু শেখকে গ্রেফতার করেছে, এখন আমাদের দাবি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে এই পিশাচের দৃষ্টান্তমূলক ফাঁসি।

ইরার কাটা শ্বাসনালী আমাদের বোবা বিবেককে চিৎকার করে ডাকছে। আমরা কি এবারও কেবল ‘শোক’ প্রকাশ করেই দায় সারব, নাকি এই পাশবিকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াব? সীতাকুণ্ডের পাহাড়ে ঝরে পড়া এই রক্ত যেন বৃথা না যায়। বিচার চাই ইরা হত্যার, বিচার চাই প্রতিটি লুণ্ঠিত শৈশবের।

ওমর ফারুক, গণমাধ্যমকর্মী

ডিজিএন/এফএ

banner
Link copied!