মধ্যপ্রাচ্য আজ এক বিশাল আগ্নেয়গিরির মোহনায় দাঁড়িয়ে, যার প্রতিটি কম্পন অনুভূত হচ্ছে পুরো পৃথিবীতে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানের প্রাণকেন্দ্রে মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর খবরটি ছিল গত চার দশকের মধ্যে এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক ভূমিকম্প। ১৯৮৯ সাল থেকে যে লৌহমানবের অঙ্গুলি হেলনে পরিচালিত হতো ইরানের সব নীতি, সেই দীর্ঘ ৩৭ বছরের ‘খামেনি অধ্যায়’-এর সমাপ্তি ঘটেছে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে।
খামেনির মৃত্যু কেবল একজন ব্যক্তির প্রস্থান নয়, বরং এটি ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কাঠামোর ওপর এক চরম আঘাত। হোয়াইট হাউজ থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তেল আবিব থেকে নেতানিয়াহু এই হামলাকে ‘শান্তির পথে বড় পদক্ষেপ’ হিসেবে দাবি করলেও, খোদ ইরানে এর প্রতিক্রিয়া হয়েছে মারমুখী। খামেনির পাশাপাশি তার পরিবারের সদস্য এবং শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের নিহত হওয়ার খবর তেহরানকে এক অভিভাবকহীন সংকটের মুখে ফেলেছে। বিশেষজ্ঞ পিবোদি মনে করছেন, কদস ফোর্সের প্রধানের পর খামেনির এই মৃত্যু ইরানকে এক বড় ধরনের উত্তরাধিকার দ্বন্দ্বে ফেলে দিতে পারে।
খামেনির মৃত্যুর পর ইরান যে চুপ করে থাকবে না, তার প্রমাণ মিলেছে গত কয়েক দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতে। ইরান কেবল ইসরায়েল নয়, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করেও শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে। দুবাই, কাতার, বাহরাইন এমনকি কুয়েতের মার্কিন ঘাঁটিতেও আঘাত হেনেছে ইরানি ড্রোন। বুধবার (৪ মার্চ) তুরস্কের দিকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রটি ন্যাটোর মাধ্যমে মাঝপথে ধ্বংস করা না হলে সংঘাত হয়তো পুরো ইউরোপ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ত।
অন্যদিকে, শ্রীলঙ্কা উপকূলে ইরানি যুদ্ধজাহাজ ‘আইআরআইএস দেনা’ ডুবে যাওয়া এবং শত শত নাবিকের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি এই যুদ্ধের ভয়াবহতাকে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দাবি করছে, গত ৪ দিনে তারা ইরানের ২ হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। ট্রাম্পের ভাষায়, “ইরান এখন একটি বিধ্বস্ত দেশ।” কিন্তু ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়েও ইরানের এই মরণকামড় বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। হরমোজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি বিশ্ববাজারে তেলের দামকে আকাশচুম্বী করে তুলতে পারে, যার প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও।
যুদ্ধের এই ডামাডোলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। ইরানে ইতিমধ্যে সহস্রাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আকাশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও কুয়েতে আটকা পড়েছেন হাজার হাজার বাংলাদেশি প্রবাসী। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিশেষ ফ্লাইট কিংবা বিমানের ফ্লাইট বাতিল সবই জানান দিচ্ছে যে এই যুদ্ধের আঁচ এখন আমাদের ঘরের দুয়ারেও পৌঁছে গেছে।
আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যু পরবর্তী ইরান কি ভেঙে পড়বে, নাকি আরও বেশি উগ্র জাতীয়তাবাদে উজ্জীবিত হয়ে সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়াবে সেই প্রশ্নই এখন বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, মধ্যপ্রাচ্যে যে যুদ্ধের দাবানল জ্বলে উঠেছে, তা নেভানোর কোনো সহজ পথ বর্তমানে কারও হাতে নেই। বিশ্ব আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যেখানে সামান্য ভুল পদক্ষেপ ডেকে আনতে পারে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পদধ্বনি।


আপনার মতামত লিখুন :