দীর্ঘদিন আড়ালে থাকা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বর্তমানে দেশের রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সাদা দাঁড়ি ও সাদা পোশাকে তার ছবিসমৃদ্ধ বিলবোর্ড ও পোস্টার দেখা যাচ্ছে, যেখানে বাংলাদেশের প্রথম ইসলামপন্থি সরকার গঠনের লক্ষ্যে সাধারণ মানুষের কাছে ভোট চাওয়া হচ্ছে।
৬৭ বছর বয়সী এই চিকিৎসক ও জামায়াতপ্রধান একসময় প্রায় অখ্যাত হলেও বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী পদের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। আগে তিনি মূলত ইসলামপন্থি সমর্থকদের মধ্যেই পরিচিত ছিলেন।
জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে তাদের সাবেক মিত্র বিএনপির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে যাচ্ছে। ২০২৪ সালে জেন–জি নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
মতামত জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, একসময় নিষিদ্ধ থাকা জামায়াতে ইসলামি তাদের ইতিহাসের সেরা নির্বাচনী ফল অর্জনের পথে রয়েছে। এতে মধ্যপন্থি ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে।
শেখ হাসিনার শাসনামলে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে কঠোর দমন পীড়ন চালানো হয়। দলটির শীর্ষ নেতাদের কারাবন্দি করা হয় এবং ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে কয়েকজন নেতার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। একপর্যায়ে দলটি নিষিদ্ধ হলে জামায়াত আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যায়। নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ২০২২ সালে ডা. শফিকুর রহমান গ্রেপ্তার হন এবং ১৫ মাসের কারাদণ্ড ভোগ করেন।
তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে জামায়াতের ভাগ্য ঘুরে যায়। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশত্যাগের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার জামায়াতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে দলটি আবার প্রকাশ্যে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পায়।
এরপর দ্রুত মাঠে নামে জামায়াত। দাতব্য কার্যক্রম ও বন্যাদুর্গত মানুষের সহায়তার মাধ্যমে দলটি নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয়। এ সময় ডা. শফিকুর রহমানের সাদা পোশাক ও সংযত আচরণ তাকে সবচেয়ে দৃশ্যমান রাজনৈতিক মুখে পরিণত করে।
গত ডিসেম্বরে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা কথা বলার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু আমাদের কণ্ঠ রোধ করা হয়েছিল। অভ্যুত্থানের পর আমরা আবার সামনে আসার সুযোগ পেয়েছি।”
রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবন
১৯৫৮ সালে সিলেটের মৌলভীবাজারে জন্ম ডা. শফিকুর রহমানের। রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন বামপন্থি ছাত্র সংগঠনের মাধ্যমে, পরে যোগ দেন ইসলামী ছাত্রশিবিরে। ১৯৮৪ সালে জামায়াতে যোগ দিয়ে ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে অংশ নিলেও তিনি জয়ী হতে পারেননি। ২০২০ সালে তিনি দলের আমির নির্বাচিত হন।
তার স্ত্রী আমিনা বেগম একজন চিকিৎসক ও সাবেক নারী সংসদ সদস্য। তাদের দুই মেয়ে ও এক ছেলে সকলেই চিকিৎসক। সিলেটে তিনি একটি পারিবারিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, গণঅভ্যুত্থানের পর তৈরি হওয়া রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছেন ডা. শফিকুর রহমান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শফি মোস্তফা বলেন, “গণঅভ্যুত্থানের পর দৃশ্যমান কোনো জাতীয় নেতা ছিল না। শফিকুর রহমান সারা দেশ ঘুরে মিডিয়ার মনোযোগ কাড়েন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী পদের প্রতিযোগীতে পরিণত হন।”
ডা. শফিকুর রহমান জামায়াতকে একটি পরিচ্ছন্ন, ইসলামি মূল্যবোধভিত্তিক ও দুর্নীতিবিরোধী রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে তুলে ধরছেন। তিনি সব ধর্মের নাগরিকের সমান অধিকারের কথা বললেও নারীবিষয়ক কিছু নীতির কারণে সমালোচনার মুখেও পড়েছেন।
তবে তার বক্তব্য, “জামায়াত একটি মধ্যপন্থি দল। আমরা নমনীয় ও যুক্তিসঙ্গত। আমাদের মূলনীতি কোরআনভিত্তিক, আর কোরআন শুধু মুসলমানদের জন্য নয় সব মানুষের জন্য।”
সূত্র: রয়টার্স


আপনার মতামত লিখুন :