তিনি ছিলেন এক ক্লান্তিহীন অভিযাত্রী। একাত্তরের কালরাত্রিতে যার কণ্ঠস্বর অবরুদ্ধ জাতিকে জুগিয়েছিল প্রতিরোধের সাহস, স্বাধীনতার পর সেই বীরেরই ছুটে চলা দেখা গিয়েছিল টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার পথে-প্রান্তরে, গ্রাম-গঞ্জে, এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। দুচোখ ভরা স্বপ্ন ছিল কেবল একটি-ক্ষুধা, দারিদ্র্যমুক্ত এক স্বনির্ভর ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়া। সেই মানুষটির নাম জিয়াউর রহমান। কেবল দেশের অভ্যন্তরেই নয়, যার পরিচিতি ও দূরদর্শী কূটনীতির খ্যাতি একসময় ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বজুড়ে। ১৯৭৭ সালের এপ্রিলে রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণের পর মাত্র সাড়ে তিন বছরের সংক্ষিপ্ত শাসনামলে এক সদ্য যুদ্ধবিধ্বস্ত ও তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ পাওয়া বাংলাদেশকে শক্ত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভিতের ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন তিনি।
আজ ৩০ মে, আধুনিক বাংলাদেশের এই ক্ষণজন্মা রাষ্ট্রনায়কের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী। ১৯৮১ সালের এই দিনে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে কিছু বিপথগামী সেনাসদস্যের নির্মম বুলেটের আঘাতে থমকে গিয়েছিল লাল-সবুজের পতাকাকে বিশ্বমঞ্চে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া এক স্বপ্নের যাত্রা।
অর্থনৈতিক বিপ্লব: কৃষি, পোশাক খাত ও রেমিট্যান্সের ভিত্তি স্থাপন:- রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে নেওয়ার পর জিয়াউর রহমান অনুধাবন করেছিলেন, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী না হলে একটি দেশের স্বাধীনতা অর্থহীন। সেই লক্ষ্যে তিনি প্রথমেই হাত দেন কৃষিখাতে।
খাল খনন ও সবুজ বিপ্লব: খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে কৃষিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন তিনি। তাঁর হাত ধরেই দেশজুড়ে শুরু হয় ঐতিহাসিক ‘খাল খনন কর্মসূচি’। নদীর পানি সেচের মাধ্যমে কৃষিজমিতে পৌঁছে দিয়ে তিনি শস্য উৎপাদনে এক নীরব বিপ্লব ঘটান, যা দেশকে প্রথমবারের মতো চাল রপ্তানির যোগ্য করে তোলে।
গার্মেন্টস ও রেমিট্যান্সের সূচনা: বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনীতির দুটি মূল চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্প এবং প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) উভয়েরই সুদূরপ্রসারী ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল জিয়ার আমলে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের লক্ষ্যে তিনি প্রথম প্রবাসে সরকারি উদ্যোগে দক্ষ ও অদক্ষ মানবসম্পদ রপ্তানির দ্বার উন্মোচন করেন, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে পোশাক কারখানার লাইসেন্স ও প্রণোদনা দিয়ে তৈরি পোশাক খাতের বৈপ্লবিক যাত্রার সূচনা করেন।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা: তাঁর শাসনামলে দেশে গণশিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়, যার ফলে দেশজুড়ে রাতারাতি স্বাক্ষরতার হার বাড়তে থাকে। গ্রামীণ পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে ‘পল্লী চিকিৎসক’ ও থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আধুনিকায়ন কোটি কোটি সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করে।
বাকশালের অবসান ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারা: রাজনৈতিক অঙ্গনে জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক অবদান ছিল ১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত একদলীয় শাসনব্যবস্থা ‘বাকশাল’-এর অবসান ঘটানো। তিনি দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন ঘটান।
জাতীয়তাবাদের কালজয়ী আদর্শে দেশের আপামর সাধারণ মানুষকে উজ্জীবিত করার লক্ষ্যে তিনি ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। প্রথাগত রাজনীতির বাইরে গিয়ে একদল দেশপ্রেমিক ও দক্ষ টেকনোক্র্যাট, বুদ্ধিজীবী এবং তৃণমূলের মানুষকে এক সুতায় গেঁথেছিলেন তিনি। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সেই দল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দর্শনকে ধারণ করে আজও জনগণের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয় এবং পরবর্তী সময়ে দেশের ইতিহাসে চারবার জনগণের ভোটে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে।
স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও ‘সার্ক’ (SAARC) প্রতিষ্ঠা: আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জিয়াউর রহমান ছিলেন এক প্রাজ্ঞ রাষ্ট্রনায়ক। কোনো পরাশক্তির পদলেহন না করে ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’-এই নীতির ওপর দাঁড়িয়ে তিনি স্বাধীন ও সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতির শক্ত ভিত্তি গড়ে তোলেন। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে বাংলাদেশি শ্রমবাজার তৈরি ছিল তাঁর অন্যতম বড় সাফল্য।
বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী ইরান-ইরাক যুদ্ধ বন্ধে ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের বিশেষ কমিটিতে তাঁর প্রতিনিধিত্ব ও মধ্যস্থতা বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে মহিমান্বিত করেছিল। এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশের মধ্যে পারস্পরিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা, সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান ও আঞ্চলিক স্বার্থ রক্ষায় তাঁর একক দূরদর্শী পরিকল্পনা ও উদ্যোগে গঠিত হয় ‘সার্ক’ (SAARC), যা দক্ষিণ এশীয় কূটনীতিতে বাংলাদেশকে নেতৃত্বের আসনে বসায়।
‘জিয়া বেঁচে থাকলে বদলে যেত ৫৬ হাজার বর্গমাইল’: বর্তমান জাতীয় সংসদের স্পিকার বীর মুক্তিযোদ্ধা হাফিজ উদ্দিন আহমদের মতে, জিয়াউর রহমান বেঁচে থাকলে বাংলাদেশ অনেক আগেই বিশ্বের বুকে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারত। শহীদ জিয়ার স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে স্পিকার আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “পরবর্তী সরকারগুলো যদি রাজনৈতিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে জিয়ার দেখানো অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক পথ অনুসরণ করত, তাহলে আজ ৫৬ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশের চিত্র পুরোপুরি বদলে যেত।”
হাফিজ উদ্দিন আহমদ আরও বলেন: “জিয়াউর রহমান কেবল একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাই নন, রাষ্ট্রপতি হিসেবেও তিনি এ দেশের সাধারণ মেহনতি মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। ক্ষমতার শীর্ষবিন্দুতে থেকেও স্বজনপ্রীতি বা দুর্নীতি তাঁকে কখনো স্পর্শ করতে পারেনি। তাঁর মৃত্যুর পর পুরো দেশবাসী অবাক হয়ে দেখেছে যে, এই বিশাল দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হওয়া সত্ত্বেও তাঁর কোনো ব্যক্তিগত বাড়ি, গাড়ি বা ব্যাংক ব্যালেন্স ছিল না। তাঁর ছেঁড়া গেঞ্জি আর সুটকেসের গল্প কোনো রূপকথা নয়, এক নির্মম সততার দলিল। তাঁর পররাষ্ট্রনীতি ছিল সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং তিনি প্রতিটি ক্ষেত্রে এ দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন। এ কারণেই জানাজায় লাখো মানুষের ঢল নেমেছিল। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে দেশের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তা আজও পূরণ হয়নি।”
তিনি আরও যোগ করেন, “মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলার বীরত্বগাথা যেমন আমাদের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তেমনি স্বাধীনতার পর মাত্র সাড়ে তিন বছরে আধুনিক ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গঠনে তাঁর অবদানও এ দেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।”


আপনার মতামত লিখুন :