ল্যাটিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এই দুর্যোগে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৬৪ জনে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া সরকারিভাবে আরও অন্তত ৯৭১ জন গুরুতর আহত হওয়ার তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছে। ভূমিকম্পের ১২ ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও এখনো দেশটির ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত চিত্র স্পষ্ট হয়নি।

দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল ‘ভেনেজোলানা দে টেলিভিশন’-এ দেওয়া এক জরুরি বক্তব্যে এই হতাহতের তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মূল দুটি বড় কম্পনের পর দেশটিতে অন্তত ৩০টি শক্তিশালী ‘আফটারশক’ বা অনবরত মৃদু কম্পন অনুভূত হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, ভূমিকম্পে সবচেয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজধানী কারাকাসের ঠিক উত্তরে অবস্থিত লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্য। সেখানে ‘বেশ কয়েকটি’ বহুতল ভবন হুড়মুড় করে ধসে পড়েছে। বিবিসি ভেরিফাই-এর উপগ্রহ চিত্র ও ভিডিও বিশ্লেষণে দেখা গেছে, লা গুয়াইরার বিখ্যাত ‘হোটেল এডুয়ার্ডস’ নামের একটি বিলাসবহুল ১০ তলা ভবন ভূমিকম্পের প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে পুরোপুরি ধসে মাটির সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে।

এদিকে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা আরও বড় ধরনের আফটারশকের আশঙ্কার কথা জানানোয় ভেনেজুয়েলার হাজার হাজার মানুষ ঘরে ফিরতে ভয় পাচ্ছেন। রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন বিধ্বস্ত শহরের বাসিন্দারা ফুটবল মাঠ, রাস্তা, ফুটপাথ ও খোলা উদ্যানে গদি, মাদুর বা চাদর পেতে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছেন।

ভেনেজুয়েলার এই চরম মানবিক বিপর্যয়ের পর বিশ্ব সম্প্রদায় দ্রুত সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের সাথে কথা বলে যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত ‘জোরালো ও দ্রুত’ সাড়া দিচ্ছে। ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া এবং লস অ্যাঞ্জেলস থেকে বিশেষায়িত আন্তর্জাতিক অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল ভেনেজুয়েলার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করেন, ভেনেজুয়েলার প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এর একটি রানওয়েতে বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। এই সংকটে বিধ্বস্ত ভবনগুলোর নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

জার্মানি: ত্রাণ ও উদ্ধার সামগ্রী নিয়ে ৬টি সামরিক বিমান পাঠাতে প্রস্তুত।
সুইজারল্যান্ড: ৮০ জন অভিজ্ঞ উদ্ধারকর্মী, ৮টি উদ্ধারকারী কুকুর এবং ১৮ টন আধুনিক সরঞ্জাম পাঠাচ্ছে।
নেদারল্যান্ডস: জরুরি উদ্ধার অভিযানের জন্য ২ মিলিয়ন ইউরো (১.৭ মিলিয়ন পাউন্ড) বরাদ্দ করেছে।
অন্যান্য দেশ: স্পেন, ফ্রান্স, ভারত ও চীন দ্রুত উদ্ধারকর্মী ও চিকিৎসাসামগ্রী পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে।

এদিকে দেশজুড়ে বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ বিপর্যয় এবং মানুষের জরুরি তথ্যের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে ভেনেজুয়েলা সরকার একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিবিসি নিউজ মুন্ডো জানিয়েছে, ভূমিকম্পের পরপরই দেশটিতে দীর্ঘ ৩ বছর ধরে অবরুদ্ধ বা সেন্সরড থাকা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার) সবার জন্য আবার উন্মুক্ত বা আনব্লক করে দেওয়া হয়েছে।

২০২৪ সালের আগস্টে মাদুরো সরকারের একটি বিতর্কিত রাষ্ট্রীয় আদেশের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলায় সোশাল সাইটটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তবে ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলো নিশ্চিত করেছে যে, দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিকম অপারেটর ক্যানটিভি সহ থান্ডারনেট, ডিজিটেল ও মুভিস্টারের মতো বেসরকারি অপারেটররা এক্স-এর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে। এর আগে জাতিসংঘের স্বাধীন তথ্য-সন্ধানী দলও উদ্ধারকাজে গতি আনতে এবং মানুষ যাতে একে অপরের খোঁজ নিতে পারে, সেজন্য সব গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমের ওপর থেকে সেন্সরশিপ তুলে নেওয়ার জন্য ভেনেজুয়েলা সরকারকে জোর আহ্বান জানিয়েছিল।


আপনার মতামত লিখুন :