কালো পোশাক পরে, নিজের বুকে হাত দিয়ে সশব্দে চাপড়িয়ে `ইয়া হোসেন, ইয়া হোসেন` স্লোগানে শোকের মাতম তোলা পুরান ঢাকার হোসেনি দালান ইমামবারার ‘তাজিয়া মিছিল’ বাংলাদেশের মহররম মাসের সবচেয়ে বড় ও ঐতিহ্যবাহী উৎসব। কেবল এই একটি ইমামবারাই নয়; ঢাকার শিয়া অধ্যুষিত মোহাম্মদপুর, মিরপুরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই মিছিল বের হওয়ার রীতি শত বছরের পুরোনো।
আরবি বর্ষপঞ্জী অনুযায়ী পবিত্র মহররম মাসের ১০ তারিখকে ‘আশুরা’ হিসেবে পালন করা হয়, যা বাংলাদেশে একটি সরকারি ছুটির দিন। ইসলামের ইতিহাস অনুযায়ী, হিজরি ৬১ সনের এই দিনেই ফোরাত নদীর তীরে কারবালার প্রান্তরে ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হোসাইন ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে ইয়াজিদের সৈন্যদের হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন। বিশ্বজুড়ে সুন্নি মুসলিমরা এই দিনে প্রধানত নফল রোজা পালন করলেও, শিয়া সম্প্রদায়ের কাছে কারবালার এই স্মরণে শোক পালনই মূল অনুষঙ্গ।
আরবি ভাষা থেকে উৎপত্তি হওয়া `তাজিয়া` শব্দটির আভিধানিক অর্থ হলো শোক, সান্ত্বনা বা সমবেদনা প্রকাশ করা। উর্দু ও ফারসি ভাষাতেও এই শব্দটি বহুল প্রচলিত।
আমেরিকান শিক্ষাবিদ ও ধর্মতাত্ত্বিক জন নরম্যান হলিস্টারের বিখ্যাত "দ্য শিয়া অব ইন্ডিয়া" বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, মূল অর্থে শব্দটি সহানুভূতি প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত হলেও বিশেষ অর্থে এটি ইমাম হোসাইনের শোকগাঁথা প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অন্যদিকে, বাংলাদেশ জাতীয় জ্ঞানকোষ ‘বাংলাপিডিয়া’র বিবরণ অনুযায়ী-সাধারণ অর্থে শোক প্রকাশ বোঝালেও, বিশেষ অর্থে কারবালার যুদ্ধে নিহত ইমাম হোসাইনের সমাধির বা মাজারের যে কৃত্রিম প্রতিকৃতি তৈরি করা হয়, তাকেই ‘তাজিয়া’ বলা হয়।
তাজিয়া মিছিলে ইমাম হোসাইনের সমাধির যে প্রতিকৃতি ব্যবহার করা হয়, তা মূলত কাঠ, রঙিন কাগজ, সোনা, রূপা কিংবা মার্বেল পাথর দিয়ে তৈরি করা হয়। ঢাকার হোসেনী দালানের মূল তাজিয়াটি কাঠ ও খাঁটি রূপার নিখুঁত আবরণ দিয়ে তৈরি, যা তৎকালীন ঢাকার নবাব খাজা সলিমুল্লাহ দান করেছিলেন।

এই মিছিলের কিছু সুনির্দিষ্ট ও ঐতিহ্যবাহী বৈশিষ্ট্য রয়েছে:
আলম বাহিনী: মিছিলের একেবারে অগ্রভাগে থাকে `আলম` বহনকারী দল। ‘আলম’ হলো একটি বিশাল দণ্ড, যার মাথায় একটি খোলা পাঁচ আঙুলের হাতের আকৃতি (পাঞ্জাতন) বা বিশেষ ক্রেস্ট ও ব্যানার বসানো থাকে। এই পাঞ্জাতন মূলত নবী পরিবারের প্রধান পাঁচজন সদস্যকে নির্দেশ করে।
মাতম ও জিঞ্জির: ঐতিহ্যগতভাবে মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা বুক চাপড়ে মাতম করেন। অনেকে আবার ধারালো জিঞ্জির (শিকল) বা ব্লেড দিয়ে নিজের পিঠে আঘাত করে শরীর রক্তাক্ত করার মাধ্যমে শোক প্রকাশ করেন। (যদিও সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এবার মিছিলে সব ধরনের ছুরি, চাকু, লাঠি, তরবারি ও বর্শা বহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে)।
দুলদুল ও শিবিকা: তরবারি দলের পেছনে দুটি শিবিকা বা বিশেষ পালকির সাথে একটি সুসজ্জিত সাদা ঘোড়া টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। এই ঘোড়াটিকে ইমাম হোসাইনের প্রিয় যুদ্ধাশ্ব ‘দুলদুল’-এর প্রতীক ধরা হয়, যার পায়ের ওপর আছড়ে পড়ে ভক্তরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।
মজার বিষয় হলো, শিয়া মতবাদের মূল কেন্দ্র ইরাক ও ইরানে হলেও সেখানে শোক মিছিলে এভাবে কৃত্রিম ‘তাজিয়া’ বা সমাধির প্রতিকৃতি বহন করার রেওয়াজ নেই। এটি মূলত ভারতীয় উপমহাদেশীয় মুসলিমদের একটি নিজস্ব সংস্কৃতি।
ইসলামিক স্কলার অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুর রশীদ বলেন, “মুঘল আমলে এই অঞ্চলে শিয়া সংস্কৃতির ব্যাপক বিকাশ ঘটে। বিশেষ করে সম্রাট শাহজাহানের পুত্র শাহ সুজা (১৬৩৯-১৬৫৯ খ্রিস্টাব্দ) যখন বাংলার সুবেদার হিসেবে ঢাকায় ছিলেন, তখন রাজদরবারে শিয়াদের প্রভাব প্রবল হয়। ইতিহাসবিদদের ধারণা, সুবেদার শাহ সুজার আমলেই বাংলায় প্রথম আনুষ্ঠানিক তাজিয়া মিছিলের প্রচলন শুরু হয়।”
ইতিহাস থেকে জানা যায়, শাহ সুজার সময়েই তাঁর কর্মকর্তা সৈয়দ মীর মুরাদ ১০৫২ হিজরি সনে (১৬৪২ খ্রিস্টাব্দে) ঢাকার ঐতিহাসিক ‘হোসেনি দালান’ নির্মাণ করেন। মীর মুরাদ তৎকালীন নওয়ারা মহলের দারোগা ছিলেন এবং তিনি মহররমের সময় এখানে দুঃস্থদের মাঝে অন্নদান করতেন। পরবর্তীতে ঢাকার নায়েব-নাজিমদের অধিকাংশ শিয়া হওয়ায় ঢাকা, মানিকগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, সিলেট ও সৈয়দপুরে বড় বড় ইমামবারা গড়ে ওঠে।
ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুনের বিখ্যাত "ঢাকা: স্মৃতি-বিস্মৃতির নগরী" বইয়ের তথ্য এবং প্রখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ অধ্যাপক আহমদ হাসান দানীর গবেষণা অনুযায়ী—ঢাকায় সুবেদার ইসলাম খাঁর আসার আগেই, অর্থাৎ ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে ফরাসিগঞ্জে ‘বিবি কা রওজা’ নামের একটি প্রাচীন ইমামবারা নির্মাণ করেছিলেন জনৈক আমীর খান। সেই তথ্য অনুযায়ী, সুবেদার শাহ সুজারও অন্তত ৪০ বছর আগে মুঘল আমলের শুরু থেকেই ঢাকায় বেশ জাঁকজমকের সাথে মহররমের শোক উৎসব ও মিছিল পালিত হতো।
ব্রিটিশ আমলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলেও এই উৎসবের ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল। ১৮৩২ সালে ইতিহাসবিদ জেমস টেইলর তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছিলেন যে, তৎকালীন কোম্পানি সরকার ঢাকার নায়েব নাজিমদের প্রতি বছর আড়াই হাজার টাকা ভাতা দিত কেবল এই হোসেনী দালানে মহররমের উৎসব ও তাজিয়া মিছিল সুচারুভাবে সম্পন্ন করার জন্য। সেই থেকে আজ অব্দি, ঢাকার অন্যতম প্রধান এক আদি সংস্কৃতির ধারক হিসেবে প্রতি বছরই সগৌরবে ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সাথে পালিত হয়ে আসছে পবিত্র আশুরার এই তাজিয়া মিছিল।


আপনার মতামত লিখুন :