ঢাকা শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩
Daily Global News
ঢাকার কাছাকাছি একের পর এক ভূমিকম্প

বড় কোনো বিপর্যয়ের পূর্বাভাস? যা বলছেন গবেষকেরা

ডিজিএন ডেস্ক

প্রকাশিত: জুন ২৪, ২০২৬, ১২:৩১ পিএম

বড় কোনো বিপর্যয়ের পূর্বাভাস? যা বলছেন গবেষকেরা

গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভূ-কম্পনের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সাধারণ মানুষকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়ে তুলছে আরেকটি বিষয় ভূমিকম্পগুলোর উৎপত্তিস্থল বা কেন্দ্র। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া একাধিক মাঝারি ও মৃদু ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল খোদ রাজধানী ঢাকার একদম কাছাকাছি বা চারপাশের জেলাগুলোতে।

সর্বশেষ গত ২২শে জুন সোমবার রাত ৮টা ২৮ মিনিটে কেঁপে ওঠে ঢাকাসহ আশপাশের এলাকা। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা এবং বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রিখটার স্কেলে ৪ থেকে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার এই ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার পূর্বে, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর সীমান্ত সংলগ্ন রূপগঞ্জ এলাকায়। এর আগে গত পহেলা ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের কালিয়াকৈরেও ৩ দশমিক ২ মাত্রার একটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছিল। ঘন ঘন ঢাকার উপকণ্ঠে এমন কম্পন আসলে কী বার্তা দিচ্ছে তা নিয়ে নতুন করে সমীকরণে বসেছেন দেশের শীর্ষ ভূ-বিজ্ঞানীরা।

ভূমিকম্প গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে গত বছর ২০২৫ সালের ২১শে নভেম্বর নরসিংদীর মাধবদী এলাকায় ঘটে যাওয়া ৫ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পটি। গত কয়েক দশকে দেশের অভ্যন্তরে উৎপত্তি হওয়া এটিই অন্যতম শক্তিশালী কম্পন, যার কেন্দ্র ছিল ঢাকা থেকে মাত্র ১৩ কিলোমিটার দূরে। ওই ভূমিকম্পের আঘাতে ঢাকা, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জে ১০ জন নিহত এবং সাড় চার শতাধিক মানুষ আহত হন।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় ছিল, ওই মূল কম্পনের কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে নরসিংদীর পলাশ, ঘোড়াশাল, শিবপুর এবং খোদ ঢাকার বাড্ডা এলাকায় আরও ৩টি আফটারশক বা ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. বদরুদ্দোজা মিয়া এই বিষয়ে বলেন: “সাম্প্রতিক এসব ঘন ঘন কম্পন মূলত ভূ-অভ্যন্তরের টেকটোনিক কার্যকলাপের কারণে হচ্ছে। বাংলাদেশ ইউরেশিয়ান, ইন্ডিয়ান এবং বার্মিজ এই তিনটি গতিশীল প্লেটের সংযোগস্থলের মাঝামাঝি অবস্থিত। এই প্লেটগুলোর নড়াচড়ার কারণে অনেক সময় নতুন ফল্ট বা চ্যুতি রেখার সৃষ্টি হয়, আবার দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা কোনো পুরোনো ফল্টও পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।”

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পূরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও দেশবরেণ্য ভূমিকম্প গবেষক মেহেদি আহমেদ আনসারীর মতে, ঢাকার কাছাকাছি যেসব ৪ বা ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হচ্ছে, তা থেকে বড় কোনো ভবনধস বা ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা নেই। তবে এগুলো আমাদের বড় ধরণের সতর্কবার্তা দিচ্ছে।

ইতিহাস ও রিটার্ন পিরিয়ড (পুনরাবৃত্তির চক্র) বিশ্লেষণ করে অধ্যাপক আনসারী জানান, ঐতিহাসিকভাবে নরসিংদী বা ঢাকার আশপাশে বড় কোনো ভূমিকম্পের রেকর্ড নেই। কিন্তু ঢাকা থেকে ১৫০ থেকে ২০০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে থাকা সীমান্ত অঞ্চলগুলো অতীতে বড় বড় ভূমিকম্প দেখেছে। যেমন ১৮৮৫ সালে বগুড়ার শেরপুরে ৭ দশমিক ১ মাত্রা এবং ১৯১৮ সালে সিলেটের শ্রীমঙ্গলে ৭ দশমিক ৬ মাত্রার প্রলয়ঙ্কারী ভূমিকম্প হয়েছিল।

তিনি সতর্ক করে বলেন, “সাত মাত্রার এই বড় ভূমিকম্পগুলোর একটি নির্দিষ্ট রিটার্ন পিরিয়ড বা চক্র থাকে, যা সাধারণত ১৫০ থেকে ২০০ বছর পর পর ফিরে আসে। সেই হিসেবে বগুড়া বা শ্রীমঙ্গলের ওই ফল্টগুলোর সময় কিন্তু ঘনিয়ে এসেছে এবং সাত মাত্রার একটি বড় ভূমিকম্প যেকোনো সময় আমাদের এই অঞ্চলে আঘাত হানতে পারে। সেটি আজকেও হতে পারে, আবার ২০ বছর পরেও হতে পারে। আর তেমনটি হলে অপরিকল্পিত ঢাকার কয়েক বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি ও ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ঘটবে।”

ভূ-বিজ্ঞানীদের মতে, পরিচিত এই পাঁচটি ফল্ট লাইনের বাইরেও বাংলাদেশের বড় বিপদ লুকিয়ে আছে ‘ব্লাইন্ড ফল্ট’-এর মধ্যে। এগুলো হলো এমন কিছু চ্যুতি রেখা যা ভূ-পৃষ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছায় না এবং মাটির ওপরে কোনো চিহ্ন না থাকায় সাধারণ ভূতাত্ত্বিক মানচিত্রে সহজে ধরা পড়ে না। বাংলাদেশে মূলত ময়মনসিংহ এবং রংপুরে দুটি ব্লাইন্ড ফল্ট চিহ্নিত আছে। যেহেতু এগুলো শনাক্ত করা কঠিন, তাই কোনো পূর্ব সতর্কবার্তাও পাওয়া যায় না। ঢাকার খুব কাছাকাছি এমন কোনো অদৃশ্য ফল্ট লাইন সক্রিয় হয়ে উঠছে কি না, তা নিয়ে গভীর গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবায়েত কবীর।

ভূতাত্ত্বিক দিক থেকে বিচার করলে ঢাকার উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের রমনা, মগবাজার, নিউমার্কেট, লালমাটিয়া, মতিঝিল, ধানমন্ডি, গুলশান, মিরপুর ও তেজগাঁও এলাকার মাটির গঠন মধুপুরের লাল মাটির মতো বেশ শক্ত ও প্রাচীন। অন্যদিকে, পূর্ব ও পশ্চিমে জলাশয় এবং নিচু জমি ভরাট করে গড়ে তোলা নতুন আবাসন এলাকাগুলোর পলিমাটি বেশ নরম।

তবে বুয়েটের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী মনে করিয়ে দেন, শুধু মাটির গঠন দেখে কোনো এলাকাকে নিরাপদ বা ঝুঁকিপূর্ণ বলা মুশকিল। আসল নিরাপত্তা নির্ভর করে ভবনের নির্মাণশৈলী ও কাঠামোগত মানের ওপর। তাঁর মতে, পুরান ঢাকার রাস্তা সরু হওয়ায় দুর্যোগের সময় উদ্ধারকাজ চালানো কঠিন হতে পারে, কিন্তু সেখানকার বহু পুরোনো ভবন শত বছর ধরে ভূমিকম্প সহ্য করে টিকে আছে। অপরপক্ষে, নতুন ঢাকার অনেক বহুতল ভবন জলাশয় ভরাট করা নরম মাটিতে যথাযথ নিয়ম না মেনে তৈরি করায় সেগুলো চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। বড় বিপর্যয় এড়াতে ঢাকার প্রতিটি ভবন দ্রুত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রি-ইনফোর্সমেন্ট বা শক্তিশালী করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সূত্র: বিবিসি।

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!