ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ, ২০২৬, ২৮ ফাল্গুন ১৪৩২
Daily Global News

তেলের বাজারে ‘যুদ্ধের’ আঁচ: সংকট কি সরবরাহে নাকি আতঙ্কে?

ওমর ফারুক

প্রকাশিত: মার্চ ১১, ২০২৬, ১০:০৮ পিএম

তেলের বাজারে ‘যুদ্ধের’ আঁচ: সংকট কি সরবরাহে নাকি আতঙ্কে?

রাজধানীর বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়া আমাদের চেনা বাজারের এক পুরনো ও তিক্ত অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি মাত্র। বুধবার রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে কারওয়ান বাজার সর্বত্রই এক চিত্র: ১ বা ২ লিটারের বোতল সোনার হরিণ, আর ৫ লিটারের জার মিললেও তা সীমিত। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং আসন্ন ঈদকে কেন্দ্র করে তেলের বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা কেবল অর্থনীতির সাধারণ সূত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়; এর পেছনে রয়েছে সরবরাহ চেইন ও জনস্তরের মনস্তাত্ত্বিক চাপ।

ডিলার বনাম খুচরা বিক্রেতা: লাভের গুড় কে খাচ্ছে? কারওয়ান বাজারের খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ, ডিলাররা চাহিদামতো তেল সরবরাহ করছেন না। যেখানে আগে দিনে ১০ কার্টন তেল আসত, সেখানে এখন মিলছে মাত্র দুই-তিন কার্টন। অথচ অবাক করা বিষয় হলো, গত ডিসেম্বরে নির্ধারিত ১ লিটার ১৯৫ টাকা এবং ৫ লিটার ৯৫৫ টাকার সরকারি দর কাগজে-কলমে অপরিবর্তিত থাকলেও পাইকারি পর্যায়ে অলিখিতভাবে দাম বেড়ে গেছে। আগে যেখানে ৫ লিটারের বোতলে খুচরা বিক্রেতার ১০ টাকা লাভ থাকত, এখন ডিলার পর্যায়ে বাড়তি দামের কারণে লাভ নেমে এসেছে মাত্র ৫ টাকায়। ফলে অনেক বিক্রেতা ঝুঁকি এড়াতে তেল তোলাই কমিয়ে দিয়েছেন। এরই সুযোগ নিয়ে মোহাম্মদপুরের মতো কিছু এলাকায় ১ লিটারের বোতল ২৩০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে যা স্পষ্টতই প্রকাশ্য লুণ্ঠন।

‘প্যানিক বায়িং’ এবং কৃত্রিম চাহিদার ফাঁদ: এই সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া যুদ্ধ-আতঙ্ক। আমিন বাজারের লুৎফর রহমানের মতো অনেক ক্রেতা যখন বাজারে ১ লিটার তেল পান না, তখন তারা বাধ্য হয়ে ৫ লিটারের জার কিনে ফিরছেন। আবার অনেক সামর্থ্যবান ক্রেতা ‘ভবিষ্যতে তেল পাওয়া যাবে না’ এমন আশঙ্কায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত মজুত করছেন। যার এক লিটার দরকার, সে যদি দুই লিটার কিনে ঘরে রাখে, তবে বাজারে কৃত্রিম ঘাটতি তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক। এই ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত হয়ে কেনাকাটা করার ফলে সাধারণ ও নিম্নবিত্ত মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে।

খোলা তেলের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব: বোতলজাত তেলের সরবরাহ সংকটের ছায়া পড়েছে খোলা বাজারেও। মাত্র কয়েক দিনে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দাম কেজিতে ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। কারওয়ান বাজারে ২০০ টাকা ছুঁয়েছে খোলা সয়াবিন তেলের কেজি। অর্থাৎ, মধ্যবিত্ত যখন বোতলের জন্য হাহাকার করছে, নিম্নবিত্ত তখন খোলা তেলের বাড়তি দরে পিষ্ট হচ্ছে।

ভোক্তা অধিকার ও পরবর্তী পদক্ষেপ: জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ফারুক আহম্মেদ বাজার তদারকির আশ্বাস দিয়েছেন। তবে কেবল জরিমানা বা নজরদারি দিয়ে এই বিশাল সরবরাহ সংকট সামাল দেওয়া কঠিন। বর্তমান পরিস্থিতিতে তেলের মিল মালিক থেকে শুরু করে পাইকারি ও খুচরা প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। একইসাথে আমদানিকৃত ডিজেল ও ভোজ্যতেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকারের ‘হরমুজ প্রণালী’ বিষয়ক কূটনৈতিক সাফল্যগুলো জনসমক্ষে আরও জোরালোভাবে আসা উচিত যাতে মানুষের মনের আতঙ্ক কাটে।

ঈদ ঘনিয়ে আসছে। এই সময়ে তেলের বাজারের অস্থিরতা যদি এখনই নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, তবে এটি সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করে দেবে। সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যেন আন্তর্জাতিক সংকটের দোহাই দিয়ে কেউ দেশের সাধারণ মানুষের পকেট কাটতে না পারে। ক্রেতাদেরও উচিত দায়িত্বশীল হওয়া; প্রয়োজনের চেয়ে বেশি মজুত করে নিজের অজান্তেই অন্যের সংকট বাড়িয়ে না তোলা। মনে রাখতে হবে, বাজার নিয়ন্ত্রণ কেবল প্রশাসনের কাজ নয়, এটি একটি সামাজিক শৃঙ্খলাও বটে।

ওমর ফারুক, গণমাধ্যমকর্মী

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!