ঢাকা রবিবার, ১৫ মার্চ, ২০২৬, ১ চৈত্র ১৪৩২
Daily Global News

এপস্টেইন নথি প্রকাশে যুক্তরাজ্যের রাজনীতি ও রাজতন্ত্রে তীব্র ভূমিকম্প

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৭, ২০২৬, ১১:১৮ এএম

এপস্টেইন নথি প্রকাশে যুক্তরাজ্যের রাজনীতি ও রাজতন্ত্রে তীব্র ভূমিকম্প

ছবি : জেফ্রি এপস্টেইন

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জেফ্রি এপস্টেইন সংক্রান্ত নতুন নথি প্রকাশের পর আবারও বিতর্ক শুরু হলেও ইউরোপে এর প্রতিক্রিয়া অনেক বেশি গভীর ও বিস্তৃত আকার নিয়েছে। মার্কিন বিচার বিভাগ থেকে প্রকাশিত নতুন ইমেইল, বার্তা, ভিডিও ও ছবির বিশাল সংকলন প্রয়াত এই কুখ্যাত যৌন অপরাধীর সঙ্গে বিশ্বের ক্ষমতাধর ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পর্কের একটি স্পষ্ট চিত্র সামনে এনেছে।

এই নথিতে কারও নাম থাকা মানেই অপরাধ প্রমাণ হয় না—তবুও সাম্প্রতিক প্রকাশনায় ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যের বহু পরিচিত মুখকে তাদের অতীত সম্পর্ক নিয়ে ব্যাখ্যা দিতে ও কোথাও কোথাও প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। অনেকের ক্ষেত্রে এই বিতর্ক তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

নতুন প্রকাশিত তথ্যগুলোতে দেখা যাচ্ছে, এপস্টেইনের প্রভাব সমাজের উচ্চতম স্তর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ইউরোপীয় অভিজাতদের মধ্যে নতুন করে উঠে এসেছে নরওয়ের ক্রাউন প্রিন্সেস এবং স্লোভাকিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার নামও।

তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় ধাক্কা অনুভূত হচ্ছে যুক্তরাজ্যে। সেখানে রাজপরিবারের একজন সদস্য তার উপাধি ও বাসভবন হারিয়েছেন, ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির একজন প্রভাবশালী নেতা লর্ডস সভার পদ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, এবং সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে শুরু হয়েছে পুলিশি তদন্ত। এমনকি প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের রাজনৈতিক অবস্থানও চাপের মুখে পড়েছে—যদিও তার নাম নথিতে নেই।

প্রকাশিত নথিগুলোতে সাবেক প্রিন্স অ্যান্ড্রু ও সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত পিটার ম্যান্ডেলসনের সঙ্গে এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ায় একযোগে সরকার ও রাজতন্ত্র—দুই প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই সংকট তৈরি হয়েছে।

রাজপরিবার বিষয়ক লেখক রবার্ট জবসন বলেন, যুক্তরাজ্যে এই কেলেঙ্কারির প্রভাব বেশি গভীর, কারণ এটি সরাসরি রাজতন্ত্র, প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতাকাঠামো ও রাজনৈতিক অভিজাতদের প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এটি কেবল একজন অপরাধীর ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে নয়, বরং পুরো ব্যবস্থার দায় নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

তার মতে, যদি রাজপরিবারের শীর্ষ পর্যায়ের সদস্যরা এপস্টেইনের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতেন এবং তবুও কিছু না করে থাকেন, তাহলে তা ক্ষমতার অপব্যবহার। আর যদি তারা কিছুই না জানতেন, তাহলে সেটি ভয়ংকর রকমের অযোগ্যতা—দুই ক্ষেত্রই অগ্রহণযোগ্য।

বাকিংহাম প্যালেস সর্বশেষ এক বিবৃতিতে প্রিন্স অ্যান্ড্রুর সব উপাধি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে জানায়, রাজা ও রানির সহানুভূতি সব ধরনের নির্যাতনের শিকার ভুক্তভোগীদের সঙ্গে রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজা ও রানিকে প্রকাশ্যে প্রশ্ন করা হলেও তারা কোনো প্রতিক্রিয়া দেননি—যা রাজপরিবারের ক্ষেত্রে খুবই বিরল ঘটনা। এ বিষয়ে মন্তব্য করা একমাত্র সিনিয়র রাজকীয় ব্যক্তি প্রিন্স এডওয়ার্ড, যিনি বলেন, এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভুক্তভোগীদের কথা ভুলে না যাওয়া।

জবসনের ভাষায়, এই কেলেঙ্কারির মূল প্রশ্ন প্রিন্স অ্যান্ড্রুকে ঘিরে নয়; বরং দীর্ঘ এক দশক ধরে রাজপ্রাসাদ যে প্রশ্ন এড়িয়ে গেছে—তৎকালীন রানী ও বর্তমান রাজা কতটা জানতেন এবং কখন জানতেন—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় ইস্যু।

সাবেক প্রিন্স অ্যান্ড্রু, যিনি অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর নামে পরিচিত, গত অক্টোবরে এপস্টেইনের সঙ্গে ইমেইল আদান-প্রদানের তথ্য প্রকাশের পর সব রাজকীয় উপাধি হারান। সম্প্রতি তিনি রয়্যাল লজ ছেড়ে রাজা চার্লসের ব্যক্তিগত সম্পত্তি স্যান্ড্রিংহাম এস্টেটে স্থানান্তরিত হয়েছেন।

এই কেলেঙ্কারির সূত্রপাত হয়েছিল এপস্টেইনের এক ভুক্তভোগী ভার্জিনিয়া জিউফরের অভিযোগের মাধ্যমে। তিনি দাবি করেন, অ্যান্ড্রু তাকে যৌন নির্যাতন করেছিলেন। অ্যান্ড্রু অভিযোগ অস্বীকার করলেও ২০২২ সালে একটি দেওয়ানি মামলায় সমঝোতায় পৌঁছান।

নথিতে দেখা যাচ্ছে, অ্যান্ড্রু দাবি করেছিলেন যে তিনি ২০১০ সালের পর এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। কিন্তু প্রকাশিত ইমেইল বলছে, ২০১১ সালেও তাদের যোগাযোগ ছিল এবং এমনকি ২০১৭ সাল পর্যন্ত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে চিঠিপত্র চালাচালি হয়েছে।

সম্প্রতি আরও একজন নারী দাবি করেছেন, তাকে এপস্টেইন অ্যান্ড্রুর কাছে পাঠিয়েছিলেন। বিষয়টি নিয়ে থেমস ভ্যালি পুলিশ প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছে।

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত হিসেবে লর্ড পিটার ম্যান্ডেলসনকে নিয়োগ দেওয়ায় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন। পরে তিনি সংসদে স্বীকার করেন, এখন যা জানা গেছে, তা আগে জানলে এমন নিয়োগ দিতেন না।

স্টারমার বলেন, এপস্টেইনের ভুক্তভোগীরা যে ভয়াবহ মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করেছেন, তা কল্পনাও করা কঠিন। তিনি প্রকাশ্যে ক্ষমা চান এবং বলেন, ক্ষমতাবান অনেকেই তাদের দায়িত্বে ব্যর্থ হয়েছেন।

ম্যান্ডেলসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতা গোপন করেছিলেন। পরে মার্কিন কংগ্রেস প্রকাশিত ‘বার্থডে বুক’-এ এপস্টেইনকে ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ হিসেবে উল্লেখ করার তথ্য সামনে এলে তাকে পদচ্যুত করা হয়।

নতুন নথিতে দেখা যায়, এপস্টেইন ও ম্যান্ডেলসনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে যোগাযোগ ছিল, এমনকি এপস্টেইন দণ্ডিত হওয়ার পরও। আর্থিক লেনদেনের তথ্যও প্রকাশ পেয়েছে।

এই সব অভিযোগের ভিত্তিতে লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশ একজন সাবেক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে সরকারি দায়িত্বে অসদাচরণের অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে। নাম প্রকাশ না করলেও বয়স ও তথ্য মিলিয়ে বিষয়টি ম্যান্ডেলসনের দিকেই ইঙ্গিত করছে।

শেষ পর্যন্ত ম্যান্ডেলসন লেবার পার্টি ও হাউস অব লর্ডস—দুই জায়গা থেকেই পদত্যাগ করেন।

এক মার্কিন কংগ্রেসম্যান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেন, যুক্তরাজ্যে একজন রাজপুত্র ক্ষমতা হারালেন, একজন প্রভাবশালী রাজনীতিক পদত্যাগ করলেন, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর ওপরও আস্থা কমেছে—সবই এপস্টেইন নথি প্রকাশের কারণে। প্রশ্ন উঠছে, যুক্তরাষ্ট্রে এপস্টেইনের সহযোগীদের জবাবদিহির জন্য কী করা হচ্ছে?

ডেইলি গ্লোবাল নিউজ

banner
Link copied!