ঢাকা মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ, ২০২৬, ১৯ ফাল্গুন ১৪৩২
Daily Global News

শপথের মঞ্চে বিশ্বশক্তি: নতুন ঢাকার নতুন কূটনীতি

ওমর ফারুক

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬, ০৮:৪১ পিএম

শপথের মঞ্চে বিশ্বশক্তি: নতুন ঢাকার নতুন কূটনীতি

১২ ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক রায়ের পর আগামী মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) থেকে শুরু হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতির এক নতুন পরিভ্রমণ। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় যখন নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নেবে, তখন সেখানে কেবল দেশের মানুষের চোখ থাকবে না, বরং তীক্ষ্ণ নজর থাকবে দিল্লি থেকে লন্ডন আর ওয়াশিংটন থেকে বেইজিংয়ের। প্রায় দুই যুগের প্রতীক্ষা শেষে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় বসছে, তখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে কেমন হবে আগামী দিনের বৈদেশিক সম্পর্ক? বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে অমীমাংসিত সংকটের সমাধান কি এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে?

ইতিমধ্যেই যুক্তরাজ্যের ফরেন অফিস এবং ব্রিটিশ হাইকমিশন থেকে যে উষ্ণ অভিনন্দন বার্তা এসেছে, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। লন্ডনের পক্ষ থেকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অভিবাসন এবং নিরাপত্তার মতো বিষয়ে নিবিড়ভাবে কাজ করার অঙ্গীকার কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি নতুন সরকারের গ্রহণযোগ্যতার প্রাথমিক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকেও নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। পশ্চিমা বিশ্বের এই ‘সফট কর্নার’ নতুন সরকারের জন্য আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থাগুলো থেকে বিনিয়োগ আকর্ষণে বড় ঢাল হিসেবে কাজ করবে।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ভারতের অবস্থান সবসময়ই সংবেদনশীল। শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পরিবর্তে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা ও পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রির আসা নিয়ে নানামুখী বিশ্লেষণ চলছে। কূটনৈতিক শিষ্টাচার অনুযায়ী মোদীর ফরাসি সফরকে কারণ হিসেবে দেখানো হলেও, এর ভেতরে ‘অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ’ নীতি দেখছেন বিশ্লেষকরা।

নতুন সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভারতের সাথে ‘পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতা’র ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলা। তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি থেকে শুরু করে সীমান্ত হত্যার মতো দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যুগুলো এবার টেবিলে আসবে নতুন শক্তিতে। তবে আশার কথা হলো, ভারতের বিরোধী দলগুলো এবং নাগরিক সমাজের একটি বড় অংশ বাংলাদেশের এই ‘গণতান্ত্রিক উত্তরণ’কে স্বাগত জানিয়েছে। দিল্লি নিশ্চয়ই চাইবে না তাদের দীর্ঘদিনের বন্ধুর পতনের পর নতুন ঢাকার সাথে বৈরিতায় জড়াতে।

অন্যদিকে, চীন সবসময়ই স্থিতিশীলতার পক্ষে। নতুন অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিশাল ঋণের কিস্তি পরিশোধের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বেইজিংয়ের সহযোগিতা নতুন সরকারের জন্য অনস্বীকার্য হবে। পাশাপাশি সৌদি আরব ও কাতারের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন কেবল রেমিট্যান্স নয়, বরং জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও জরুরি। ১৭ ফেব্রুয়ারির শপথে কাতারের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি সেই সম্ভাবনারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বিগত সরকারের আমলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে যে এককেন্দ্রিক ঝোঁক ছিল বলে অভিযোগ ছিল, তারেক রহমানের সরকারকে সেই তকমা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ এই চিরন্তন নীতিকে এখন সক্রিয় কূটনীতিতে রূপান্তর করতে হবে।

নতুন বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির মূল ভিত্তি হতে হবে ‘জাতীয় স্বার্থ’। চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান যে আত্মমর্যাদার শিক্ষা দিয়েছে, তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে আন্তর্জাতিক প্রতিটি টেবিলে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক হবে বড় ভাই-ছোট ভাইয়ের মতো নয়, বরং দুই সার্বভৌম রাষ্ট্রের অংশীদারত্বের ভিত্তিতে।

শপথের এই মঞ্চ কেবল সরকার পরিবর্তনের সাক্ষী নয়, এটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ইমেজ পুনর্গঠনের প্রথম ধাপ। বিশ্বশক্তিগুলো এখন দেখতে চায়, একটি স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে আসা সরকার কতটা পরিণতভাবে বিশ্বরাজনীতির দাবার চালে নিজেদের জায়গা করে নেয়। মঙ্গলবার বিকেল ৪টায় যখন শপথের বাক্যগুলো উচ্চারিত হবে, তখন যেন একইসাথে উচ্চারিত হয় এক স্বাধীন, সার্বভৌম ও মর্যাদাবান বাংলাদেশের দৃপ্ত অঙ্গীকার।

ওমর ফারুক, গণমাধ্যমকর্মী

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!