ঢাকা মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ, ২০২৬, ১৯ ফাল্গুন ১৪৩২
Daily Global News

ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হাতবদল: নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির শুরু?

ওমর ফারুক

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২৬, ১০:২১ পিএম

ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হাতবদল: নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির শুরু?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার পালাবদল খুব কম সময়ই ছিল সম্পূর্ণ মসৃণ, শালীন ও প্রতীকীভাবে ঐক্যের বার্তাবাহী। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের রাজনীতিতে নির্বাচন মানেই উত্তেজনা, অবিশ্বাস, সহিংসতা এবং ফল ঘোষণার পর তীব্র মেরুকরণ। সেই প্রেক্ষাপটে সদ্য অনুষ্ঠিত শপথ অনুষ্ঠান এবং বিদায়ী ও নবনিযুক্ত নেতৃত্বের সৌহার্দ্যপূর্ণ শুভেচ্ছা বিনিময় অনেকের কাছেই এক নতুন দৃশ্যপট উন্মোচন করেছে।

দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তারেক রহমান-এর সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ী প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস-এর করমর্দন কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা ছিল না; এটি ছিল রাজনৈতিক প্রতীক। বিরোধ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার প্রতি সম্মান জানিয়ে একে অপরকে অভিনন্দন জানানোর দৃশ্যটি দেশবাসীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে রাষ্ট্র ব্যক্তির চেয়ে বড়, আর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া দলীয় অবস্থানের ঊর্ধ্বে।

প্রশ্ন হলো, এই শান্তিপূর্ণ হাতবদল কি সত্যিই নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা? নাকি এটি কেবল একটি সময়োপযোগী কৌশল, যা আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ চাপের বাস্তবতায় তৈরি হয়েছে?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে “জিরো-সাম” মনোভাব কাজ করেছে এক দল জিতলে অন্য দল পুরোপুরি পরাজিত। ফলে সংসদ প্রায়ই কার্যকর বিতর্কের মঞ্চ না হয়ে প্রতীকী সংঘর্ষের জায়গায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু এবারের দৃশ্যপট কিছুটা ভিন্ন। একদিকে শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন, অন্যদিকে সাংগঠনিকভাবে প্রস্তুত বিরোধী শিবির এই সমীকরণ গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক হতে পারে, যদি উভয় পক্ষ পারস্পরিক সহনশীলতা বজায় রাখে।

গণতন্ত্র কেবল ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা নয়; বরং পরাজয় মেনে নেওয়ার রাজনৈতিক পরিপক্বতাও এর অপরিহার্য অংশ। ইতিহাস বলছে, যে সমাজে ক্ষমতার রদবদল শান্তিপূর্ণ হয়, সেখানে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি দ্রুত বিকশিত হয়। বিনিয়োগকারীরা আস্থা পায়, প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে কাজ করার সুযোগ পায় এবং জনগণের মধ্যে অনিশ্চয়তা কমে।

তবে আশাবাদের পাশাপাশি সতর্ক থাকারও কারণ আছে। রাজনৈতিক সংস্কৃতি একদিনে বদলায় না। করমর্দন একটি ইতিবাচক সূচনা হতে পারে, কিন্তু সেটি টেকসই সংস্কৃতিতে রূপ নিতে হলে প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, আইনের শাসনের প্রতি অঙ্গীকার এবং সংসদীয় বিতর্কের মানোন্নয়ন। বিরোধী দলের কণ্ঠরোধ বা অযথা অবরোধ দুই চরমই গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জনমত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে নাগরিকরা এখন আরও সচেতন ও প্রত্যাশাপূর্ণ। তারা কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, আচরণেও পরিবর্তন দেখতে চায়। যদি সরকার ও বিরোধী দল পরস্পরকে রাজনৈতিক শত্রু নয়, বরং গণতান্ত্রিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করে, তাহলে রাজনৈতিক ভাষার ভদ্রতা ও যুক্তিনির্ভরতা ফিরে আসতে পারে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও বিবেচ্য। বৈশ্বিক রাজনীতিতে এখন স্থিতিশীলতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের ওপর জোর বাড়ছে। উন্নয়ন সহযোগিতা, বাণিজ্য চুক্তি এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক অনেকাংশে নির্ভর করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর। সুতরাং শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর কেবল অভ্যন্তরীণ নয়, বহির্বিশ্বেও ইতিবাচক সংকেত পাঠায়।

সবশেষে বলা যায়, একটি করমর্দন ইতিহাস বদলে দেয় না, কিন্তু ইতিহাসের সম্ভাবনা তৈরি করে। যদি এই সৌজন্য বাস্তব নীতি ও আচরণে প্রতিফলিত হয় যদি সংসদে যুক্তিপূর্ণ বিতর্ক হয়, যদি বিরোধী মতকে সম্মান দেওয়া হয়, যদি নির্বাচন ও বিচারব্যবস্থা নিয়ে আস্থা গড়ে ওঠে তাহলেই আমরা বলতে পারব, এটি সত্যিই নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির শুরু।

বাংলাদেশ বহুবার সংকট দেখেছে, আবার উঠে দাঁড়িয়েছে। এখন প্রশ্ন আমরা কি সংঘাতের চক্র ভেঙে সহযোগিতার পথে হাঁটতে প্রস্তুত? ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হাতবদল সেই পথের প্রথম ধাপ হতে পারে। বাকি পথ নির্ভর করছে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রজ্ঞা এবং নাগরিক সমাজের সতর্ক দৃষ্টির ওপর।

ওমর ফারুক, গণমাধ্যমকর্মী

ডিজিএন/এফএ

banner
Link copied!