ঢাকা সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬, ১ আষাঢ় ১৪৩৩
Daily Global News

ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পন্ন: ১৯ জুন জেনেভায় মার্কিন-ইরান শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: জুন ১৫, ২০২৬, ১১:৫৭ এএম

ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পন্ন: ১৯ জুন জেনেভায় মার্কিন-ইরান শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর

অবশেষে দীর্ঘ সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে একটি ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তিতে পৌঁছেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান। এই আলোচনার প্রধান মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। আগামী ১৯শে জুন (শুক্রবার) সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আনুষ্ঠানিকভাবে এই শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি নিজ নিজ দেশের পক্ষ থেকে চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বিশ্বনেতারা এই কূটনৈতিক অগ্রগতিকে স্বাগত জানিয়েছেন।

চুক্তিতে পৌঁছানোর খবর নিশ্চিত করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ লিখেছেন, "ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে চুক্তিটি চূড়ান্ত হয়েছে। আমি এর মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো টোল বা বাধা ছাড়াই জাহাজ চলাচল পুনরায় চালুর পূর্ণ অনুমোদন দিচ্ছি এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর অবরোধ অবিলম্বে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিচ্ছি।"

বিশ্বের সব জাহাজকে যাত্রা শুরুর আহ্বান জানিয়ে ট্রাম্প বলেন, "তোমাদের ইঞ্জিন চালু করো। তেলের প্রবাহ চলতে দাও!"

বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, জেনেভায় চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স উপস্থিত থাকবেন এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও সেখানে স্বাক্ষর করতে পারেন।

যেভাবে এলো এই চুক্তি:

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, "নিবিড় আলোচনার পর আমরা আনন্দের সঙ্গে ঘোষণা করছি যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যে শান্তি চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। উভয় পক্ষ লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক কার্যক্রম অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে।"

এই সফল মধ্যস্থতার জন্য তিনি কাতার, সৌদি আরব ও তুরস্ককে ধন্যবাদ জানান। তিনি উল্লেখ করেন, আনুষ্ঠানিক চুক্তির আগে এই সপ্তাহে মধ্যস্থতাকারীরা বেশ কিছু কারিগরি ও প্রস্তুতিমূলক বৈঠক করবেন।

এদিকে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি জানিয়েছেন, কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের সাথে তেহরানে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ ঘণ্টা দীর্ঘ আলোচনার পর ‍‍`ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক‍‍`-এর খসড়া ও বিষয়বস্তু চূড়ান্ত করা হয়েছে। তিনি জানান, চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনা আগামী ৬০ দিনের একটি সময়সীমার মধ্যে চলবে এবং ইরানের প্রধান অগ্রাধিকার থাকবে তাদের ওপর আরোপিত সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ‍‍`মেহের নিউজ এজেন্সি‍‍` প্রস্তাবিত ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের খসড়ার কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রকাশ করেছে, যা ইরানের সামরিক কর্মকর্তারা তেহরানের বিজয় হিসেবে দেখছেন।

খসড়ার উল্লেখযোগ্য শর্তগুলো হলো:

স্থায়ী যুদ্ধবিরতি: লেবাননসহ সব ফ্রন্টে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা।
অবরোধ ও সেনা প্রত্যাহার: ৩০ দিনের মধ্যে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং ইরান থেকে মার্কিন বাহিনী সরিয়ে নেওয়া।
হরমুজ প্রণালি: ইরানের ব্যবস্থাপনায় ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি চালু করা।
পুনর্গঠন তহবিল: ইরান পুনর্গঠনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের পক্ষ থেকে অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা প্রদান।
নিষেধাজ্ঞা ও পারমাণবিক অঙ্গীকার: ইরানের তেল ও জ্বালানি পণ্যের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের পক্ষ থেকে পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন না করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা।

মেহের নিউজ জানিয়েছে, ইরানের জব্দকৃত তহবিলের অর্ধেক মুক্ত করা এবং নৌ অবরোধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত আলোচনা শুরু হবে না। পরবর্তীতে এই চুক্তি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদন করা হবে।


বিশ্বনেতাদের স্বাগত:

এই ঐতিহাসিক চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে জাতিসংঘ, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালি। ইউরোপীয় চার দেশের জোট (ই-ফোর) এক যৌথ বিবৃতিতে পাকিস্তান ও কাতারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছে, "এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগের মুহূর্ত।" তবে তারা একই সাথে জোর দিয়ে বলেছে, ইরান যাতে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

চলতি বছরের ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইরানজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আকস্মিক হামলার মাধ্যমে এই যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল। জবাবে ইরানও ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালায়। একপর্যায়ে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল পরিবহনের প্রধান রুট ‍‍`হরমুজ প্রণালি‍‍` বন্ধ করে দেয় ইরান। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানি বন্দরগুলো ঘিরে নৌ অবরোধ তৈরি করেছিল। দীর্ঘ অর্থনৈতিক ও সামরিক অচলাবস্থার পর এই চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির নতুন বার্তা মিলছে।

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!