যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের স্বাক্ষরিত সাম্প্রতিক সমঝোতা স্মারকটি গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যৌথ হামলা চালানোর মার্কিন-ইসরায়েলি সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক চরম ব্যর্থতাকেই স্পষ্ট করে তুলেছে।
এই যুদ্ধের মানবিক ক্ষয়ক্ষতি ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান। ইরান ও লেবাননে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের একটি বিশাল অংশই নিরীহ বেসামরিক নাগরিক। তবে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের শেষে লাভ-ক্ষতির খতিয়ান টানলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র এবং পরোক্ষভাবে ইসরায়েল এক বিশাল কৌশলগত পরাজয়ের মুখে পড়েছে।
যুদ্ধের শুরুতে তেহরানের শাসনব্যবস্থা তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আশঙ্কার মুখোমুখি হয়েছিল। বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক দানব ইসরায়েলের যৌথ হামলা তাদের গুঁড়িয়ে দেবে এমনটাই ধারণা করা হচ্ছিল। কিন্তু ইসলামি প্রজাতন্ত্রের এই শাসনব্যবস্থা শুধু টিকেই থাকেনি; বরং যুদ্ধের ধাক্কা সামলে আরও শক্তিশালী হয়ে আবির্ভূত হয়েছে।
ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মূল ভুলটি ছিল তাদের অলস ও ভ্রান্ত অনুমানের ওপর ভিত্তি করে সাজানো কৌশল। তারা ভেবেছিল, ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করতে পারলে দেশটির পুরো শাসনব্যবস্থা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। কিন্তু গত প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে ইরানের প্রতিষ্ঠানগুলো এই ধরনের বড় আঘাত প্রতিরোধ করার শক্তি সঞ্চয় করেছে।
ইরানের শাসনব্যবস্থা কঠোর দমনমূলক হতে পারে, কিন্তু এর পেছনে রয়েছে একটি ধর্মীয় আদর্শ, জাতীয় নিরাপত্তা ও আত্মত্যাগের দীর্ঘ ইতিহাস—যা মূলত ১৯৮০-এর দশকে সাদ্দাম হোসেনের ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থেকে জন্ম নিয়েছিল। ফলস্বরূপ, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুদ্ধ শুরুর দিকে তেহরানের শাসনব্যবস্থার পতন হবে বলে যে দাবি করেছিলেন, তা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
তেহরান সবসময়ই জানত বিশ্ব অর্থনীতির জন্য তাদের সবচেয়ে বড় ট্রাম্পকার্ড হলো ‘হরমুজ প্রণালি’। বিশ্ববাজারের তেল ও গ্যাসসহ অন্যান্য জরুরি সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে চলাচল করে। ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি একজন সতর্ক ব্যক্তি হওয়ায় এই জলপথকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের চূড়ান্ত ঝুঁকি নিতে চাননি।
কিন্তু যুদ্ধের শুরুতে ইসরায়েল তাকে এবং তার ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের হত্যা করার পর, তার উত্তরসূরি মোজতবা খামেনি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে নেমে কোনো দ্বিধা ছাড়াই হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন। এর বিধ্বংসী প্রভাব আরবের তেল উৎপাদনকারী রাষ্ট্রগুলোসহ বিশ্ব অর্থনীতিতে তীব্র মন্দার সৃষ্টি করে।
অবশেষে এই প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার বিনিময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন কিছু ছাড় দিতে বাধ্য হয়েছেন, যা মার্কিন কট্টরপন্থী এবং ইসরায়েল সরকারকে ক্ষুব্ধ ও উদ্বিগ্ন করেছে। চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের নৌ-অবরোধ তুলে নেবে এবং তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে, যার মাধ্যমে ইরান আবার বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয়ের সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে বিদেশে জব্দ থাকা ইরানের বিপুল সম্পদ মুক্ত করার প্রক্রিয়াও শুরু হচ্ছে।
এই সবকিছু আসলে পরিস্থিতিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে গত ২৭শে ফেব্রুয়ারির অবস্থায়, যেটি ছিল যুদ্ধের ঠিক আগের দিন। সেই দিনও হরমুজ প্রণালি খোলা ছিল এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের আলোচকেরা পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে কথা বলছিলেন।
সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) ট্রাম্পের এই নীতিকে কটাক্ষ করে লিখেছেন,
"এই যুদ্ধবিরতির একমাত্র `অর্জন` হলো হরমুজ প্রণালির সম্ভাব্য পুনরায় উন্মুক্ত হওয়া—যা যুদ্ধ শুরুর আগেও খোলাই ছিল। আর সেটি করতে গিয়েও এখন উল্টো আমাদের ইরানকে বিলিয়ন ডলার অর্থ দিতে হচ্ছে।"
এই যুদ্ধকে বিশ্লেষকেরা ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক ভুল হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে এটি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তির সূচনাও হতে পারে।
নেতানিয়াহু নিজেকে ইসরায়েলের `মিস্টার সিকিউরিটি` হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে এবং কূটনীতিকে অবজ্ঞা করে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের যে স্বপ্ন ৪০ বছর ধরে দেখছিলেন, তা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ইসরায়েলকে এক গভীর সংকটে ফেলেছেন। আগামী অক্টোবরের নির্বাচনে ভোটারদের কাছে তাকে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ব্যর্থতার কড়া জবাবদিহি করতে হবে।
সমঝোতা স্মারকটিতে লেবাননের যুদ্ধ অবিলম্বে শেষ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে ইসরায়েলের মতে এটি অসম্ভব, কারণ তারা লেবাননে অবাধ সামরিক স্বাধীনতা চায়। এই অবস্থান ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যে ফাটল আরও বাড়াতে পারে।
বর্তমান সমঝোতা স্মারকটি কোনো চূড়ান্ত চুক্তি নয়; এটি কেবল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি মূল আলোচনা শুরুর পথ। যেহেতু দুই পক্ষই একে অপরকে বিশ্বাস করে না এবং ওয়াশিংটন ও তেহরানের কট্টরপন্থীরা এই শান্তিপ্রক্রিয়া চায় না, তাই অনেক কিছুই ভুল হতে পারে।
তবুও, এই চুক্তি হাজারো মানুষের প্রাণহানি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ডেকে আনা একটি অন্তহীন যুদ্ধের চেয়ে অনেক ভালো। যদি শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষের সন্তুষ্টি অনুযায়ী একটি স্থায়ী পারমাণবিক চুক্তি আলোর মুখ দেখে, তবে তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে দিতে পারে। তবে সেটি একটি বিশাল ‘যদি’ এবং দীর্ঘ ও কঠিন আলোচনার সফলতার ওপরই নির্ভর করছে। সূত্র: বিবিসি


আপনার মতামত লিখুন :