ঢাকা শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩
Daily Global News
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা শুরু হচ্ছে

হরমুজ বন্ধের দাবি তেহরানের, লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় নিহত ৪৭

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: জুন ২১, ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম

হরমুজ বন্ধের দাবি তেহরানের, লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় নিহত ৪৭

মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ চার মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটাতে ঐতিহাসিক প্রাথমিক চুক্তির পর এবার সুইজারল্যান্ডে সরাসরি সংলাপে বসছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। আজ রোববার (২১ জুন) থেকেই এই উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। তবে এই পরমাণু ও শান্তি আলোচনার আবহেই নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ নিয়ে।

ইরানের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের প্রাণঘাতী হামলার তীব্র প্রতিক্রিয়ায় তারা আবারও হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী তেহরানের এই দাবি সরাসরি নাকচ করে দিয়ে বলেছে, "হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে।"

এই ঐতিহাসিক শান্তি আলোচনায় যোগ দিতে শনিবার গভীর রাতে ওয়াশিংটন ত্যাগ করেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। বিমানযাত্রার আগে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ভ্যান্স বলেন, তিনি এই বৈঠকে মূলত ‍‍`পারমাণবিক ইস্যু‍‍` এবং ‍‍`লেবানন যুদ্ধবিরতি ইস্যুতে‍‍` বড় ধরনের অগ্রগতি আশা করছেন। দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলা প্রসঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, “সেখানকার পরিস্থিতির আসলে উন্নতি হচ্ছে এবং সামগ্রিক উত্তেজনা কিছুটা কমছে। পুরো অঞ্চলকে নিরাপদ ও স্থিতিশীল রাখাই আমাদের মূল লক্ষ্য।”

অন্যদিকে, ইরানের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ইতোমধ্যেই সুইজারল্যান্ডে পৌঁছেছেন। এই দলে রয়েছেন দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই জানিয়েছেন, তেহরান এই বৈঠকে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে তাদের আগের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণের কড়া দাবি জানাবে।

উল্লেখ্য, যুদ্ধের শুরু থেকেই এই সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে পাকিস্তান। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার উদ্বোধনী অধিবেশনে সশরীরে অংশ নেবেন বলে তাঁর কার্যালয় নিশ্চিত করেছে।

বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয়বস্তু:

১. আগামী ৬০ দিনের মধ্যে স্থায়ী পরমাণু চুক্তির চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি।
২. লেবানন ও ইসরায়েল সীমান্তে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর।
৩. হরমুজ প্রণালির টেকসই নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সচল রাখা।

কেন হরমুজ প্রণালি আবার বন্ধের ঘোষণা দিল ইরান?

গত সপ্তাহে দুই দেশের প্রেসিডেন্টদের স্বাক্ষরিত ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের প্রথম প্রধান শর্তই ছিল ‘লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করা’। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল চুক্তির এই প্রথম ধারাটিই স্পষ্ট লঙ্ঘন করেছে।

ইরানের দাবি, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত প্রাণঘাতী হামলা মূলত তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে হওয়া যুদ্ধবিরতির সরাসরি লঙ্ঘন, আর সে কারণেই তারা হরমুজ প্রণালি পুনরায় অবরুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার পর থেকেই লেবানন ফ্রন্টে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের যুদ্ধ তীব্র রূপ নেয়।

ইরানের এই রণহুঙ্কারের পরপরই কড়া জবাব দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড। সেন্টকমের মুখপাত্র টিম হকিন্স বলেন, “জাহাজ চলাচল এখনও স্বাভাবিকভাবেই চলছে। মার্কিন নৌবাহিনী পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ইরান হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করছে না।”

মার্কিন সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, মাত্র গতকাল শনিবারই ৫৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে, যার মাধ্যমে বিশ্ববাজারে ১ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেলেরও বেশি তেল পরিবহন করা হয়েছে। বিবিসি ভেরিফাই-এর স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং ডেটাতেও অন্তত পাঁচটি বিশাল তেলবাহী ট্যাংকার হরমুজ পার হওয়ার সত্যতা মিলেছে, যদিও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির কারণে কয়েকটি জাহাজকে সাগরে ইউ-টার্ন নিতে দেখা গেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চুক্তি ঘোষণার পরও লেবানন সীমান্ত পরিস্থিতি এখনো জটিল। হিজবুল্লাহর দাবি, লেবাননে ইসরায়েলের এই হামলা মূলত মার্কিন-ইরান শান্তিপ্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করার একটি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার বৈরুতের দক্ষিণ উপশহরসহ বিভিন্ন হিজবুল্লাহ ঘাঁটিতে ইসরায়েলের ধারাবাহিক বিমান হামলায় অন্তত ৪৭ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্স দাবি করেছে, তারা হিজবুল্লাহর ৮০টি লক্ষ্যবস্তুতে সফল হামলা চালিয়ে ডজনখানেক যোদ্ধাকে হত্যা করেছে। এই লড়াইয়ে আইডিএফ-এর ৪ সেনার মৃত্যুর খবরও নিশ্চিত করা হয়েছে। গত ২রা মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই লেবানন সংঘাত কেড়ে নিয়েছে ৪ হাজার ৫৭ জন মানুষের প্রাণ।

বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি সরবরাহকারী এই হরমুজ প্রণালির বার্ষিক বাণিজ্যিক মূল্য প্রায় ৬০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ফলে সুইজারল্যান্ডের টেবিলে আজ জেডি ভ্যান্স ও ইরানি প্রতিনিধিদের বৈঠক যদি ব্যর্থ হয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি এক ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। সূত্র: বিবিসি

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!