ঢাকা রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬, ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩
Daily Global News

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী অংশ যেন মরণফাঁদ: ৭ মাসে ঝরেছে ৩৭ প্রাণ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: জুলাই ১৯, ২০২৬, ১২:২৭ পিএম

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী অংশ যেন মরণফাঁদ: ৭ মাসে ঝরেছে ৩৭ প্রাণ

দেশের অর্থনীতির লাইফলাইনখ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী অংশের ২৭ কিলোমিটার এখন যেন খানাখন্দ আর দুর্ঘটনার এক আতঙ্কের করিডোরে পরিণত হয়েছে। টানা বৃষ্টিতে কার্পেটিং উঠে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্তের, যেখানে পানি জমে থাকায় প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে হাজারো যানবাহন। ঘটছে ছোট-বড় নানা দুর্ঘটনা, আর অকালেই ঝরছে তরতাজা প্রাণ। সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের দাবি, সংস্কারকাজ চলমান রয়েছে; তবে মহাসড়কজুড়ে এখনো চরম বেহাল চিত্রই ফুটে উঠেছে।

মহাসড়কের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা যায়, ফেনীর নতুন সমিতি বাজার থেকে মুহুরীগঞ্জ, কসকা থেকে লেমুয়া সেতু এবং লেমুয়া সেতু থেকে লালপোল পর্যন্ত রাস্তাজুড়ে অসংখ্য খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টির পানিতে এই গর্তগুলো ডুবে থাকায় চালকদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

বিশেষ করে মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাসের মতো ছোট যানবাহনের চালকরা সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে রয়েছেন। গর্ত এড়াতে গিয়ে চালকরা হঠাৎ দিক পরিবর্তন করায় দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষের আশঙ্কা বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। মুহুরী সেতু থেকে কসকা পর্যন্ত কয়েকটি স্থানে ইট ও কার্পেটিং দিয়ে গর্ত ভরাট করা হলেও তা সমতল না হওয়ায় উল্টো দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বেড়েছে।

মহাসড়কের এই ভগ্নদশার কারণে যানবাহন ধীরগতিতে চলায় প্রতিনিয়ত দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। এতে বাস, ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের মতো পণ্যবাহী যানের যাতায়াতে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগছে। একই সঙ্গে বাড়ছে জ্বালানি ব্যয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গাড়ির যন্ত্রাংশ। সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ছেন রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সের যাত্রী, নারী, শিশু ও দূরপাল্লার সাধারণ মানুষ।

রেজাউল করিম নামের এক বাসচালক জানান, বারৈয়ারহাট থেকে মহিপাল আসতে এখন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগে এবং খানাখন্দের কারণে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে সারাক্ষণ দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়।

অন্যদিকে, মোটরসাইকেল চালক সায়েম চৌধুরী আক্ষেপ করে বলেন, চট্টগ্রামমুখী লেনজুড়েই ছোট-বড় গর্ত পানিতে ডুবে থাকায় মোটরসাইকেল চালকদের জন্য সড়কটি অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।

হাইওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী অংশে সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ৩৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে ফাজিলপুর অংশে ১১টি মামলায় ৯ জন এবং মহিপাল অংশে ২৪টি মামলায় ২৮ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে।

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) ফেনী জেলা কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান দারা মনে করেন, ফেনীর আয়তনের তুলনায় সড়কে যানবাহনের অত্যাধিক চাপ, বেপরোয়া গতি, চালকদের দক্ষতার অভাব এবং ফিটনেসবিহীন যানের কারণেই দুর্ঘটনা বাড়ছে।

মহিপাল হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আছাদুল ইসলাম ও ফাজিলপুর হাইওয়ে থানার ইনচার্জ শহিদুল ইসলাম জানান, বেপরোয়া গতি, চালকদের শারীরিক সক্ষমতার চেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে গাড়ি চালানো এবং ছোট যানের জন্য আলাদা সার্ভিস লেন না থাকাই এসব দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ।

মহাসড়কের এই বেহাল দশা সম্পর্কে সড়ক ও জনপথ (সওজ) ফেনীর নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীতি চাকমা জানান, টানা বৃষ্টিতে মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে এবং ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকটি স্থানে সংস্কারকাজ শুরু করা হয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন, মূলত চট্টগ্রাম বন্দর থেকে আসা ভারী পণ্যবাহী যানবাহনের অত্যাধিক চাপের কারণেই ঢাকামুখী লেনে গর্তের সৃষ্টি বেশি হয়। আগামী দুই দিন বৃষ্টি না হলে সংস্কারকাজ পুরোপুরি শেষ হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন। তা সত্ত্বেও সংস্কারকাজের ধীরগতি ও দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের অভাবে মহাসড়কে চলাচলকারী যাত্রীদের জন্য এটি এখনো এক বড় আতঙ্কের নাম হয়েই রয়েছে।

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!