প্রায় দু`বছর ভারতে অবস্থানের পর আগামী ডিসেম্বরে নেতাকর্মীদের নিয়ে বাংলাদেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের ঘোষণা দিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার এই ঘোষণায় বাংলাদেশ ও ভারতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা তার এই বক্তব্যকে দেশে ফেরার ‘চূড়ান্ত ঘোষণা’ হিসেবে না দেখে, বরং পরিস্থিতি যাচাই বা ‘জল মাপার চেষ্টা’ হিসেবেই বেশি মূল্যায়ন করছেন।
ভারত সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। সাউথ ব্লকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মতে, ভারত তাকে জোর করে তাড়িয়ে দিচ্ছে না, আবার তিনি নিজে থেকে দেশে ফিরতে চাইলেও বাধা দেবে না।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারতের প্রচ্ছন্ন সম্মতি ছাড়া শেখ হাসিনা এই ঘোষণা দেননি। এর পেছনে ভারতের দ্বিমুখী লাভ রয়েছে। তিনি সত্যি দেশে ফিরে গেলে গত দুই বছরের কূটনৈতিক অস্বস্তি থেকে ভারতের মুক্তি মিলবে এবং বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা সহজ হবে। অন্যদিকে, যদি তিনি শেষ পর্যন্ত না-ও ফেরেন, তবে ভারত দাবি করতে পারবে যে বাংলাদেশ সরকার তার প্রত্যাবর্তনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে, তাই তারা তাকে আশ্রয় দিতে বাধ্য হচ্ছে।
ডিসেম্বরে ফেরার ঘোষণার পেছনে শেখ হাসিনার বেশ কয়েকটি সুচিন্তিত রাজনৈতিক হিসাব কাজ করছে বলে মনে করছেন দিল্লির রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। চরম বিপদের মুখে ‘নেত্রী পালিয়ে গেছেন’এমন সমালোচনার মুখে থাকা কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করা এবং তাদের পাশে থাকার বার্তা দেওয়াই তার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। এছাড়া, আওয়ামী লীগকে পুনরায় দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে প্রাসঙ্গিক করতে হলে সশরীরে মাঠে থাকা জরুরি, যা ভারতে বসে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের ঘোষণার মাধ্যমে তিনি বিচারবিভাগ ও বর্তমান সরকারের ওপর একটি সুষ্ঠু ও অবাধ বিচারের নিশ্চয়তা দেওয়ার জন্য পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করছেন বলেও মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। সর্বোপরি, হাতে অন্তত পাঁচ মাস সময় রাখায় তিনি বাংলাদেশ সরকারের প্রতিক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোভাব যাচাই করার পর্যাপ্ত সুযোগ পাবেন।
২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে ভারতে আশ্রয় নেওয়া হাজার হাজার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর মধ্যে নেত্রীর ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। দলের অনেক নেতার ধারণা, দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বাড়ার আশঙ্কায় বর্তমান সরকার বা বিএনপি চাইবে না শেখ হাসিনা এখনই দেশে ফিরুক। কিছু নিবেদিতপ্রাণ কর্মী নেত্রীর সঙ্গে দেশে ফিরতে প্রবল আগ্রহী হলেও, অনেকেই কারাবন্দি হওয়ার আশঙ্কা করছেন।
শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মতে, দেশে ফিরলে শেখ হাসিনার বিচারে আন্তর্জাতিক মহলের কড়া নজর থাকবে, কিন্তু সাধারণ নেতাদের ক্ষেত্রে তা হবে না। ফলে প্রচারের আড়ালে তাদের মিথ্যা মামলায় জেলে যাওয়ার ভয় থেকেই যাচ্ছে। তাই শেষ পর্যন্ত ডিসেম্বরে শেখ হাসিনা দেশে ফিরলেও, তার সঙ্গী হয়ে ঠিক কতজন নেতাকর্মী ফিরবেন, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়ে গেছে। সূত্র: বিবিসি


আপনার মতামত লিখুন :