দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, প্রান্তিক কৃষক এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ বা সর্বজনীন কার্ড চালুর যুগান্তকারী ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার (১৫ জুলাই) জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে তিনি এই ঘোষণা দেন।
ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী দেশের অর্থনীতি, কৃষিখাত, কর্মসংস্থান, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত শহীদদের তালিকা প্রণয়নসহ নানাবিধ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী জানান, বর্তমানে চালু থাকা ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্পোর্টস কার্ড, প্রবাসী কার্ড কিংবা ইমাম-মুয়াজ্জিন ও ধর্মীয় গুরুদের জন্য দেওয়া বিশেষ কার্ডের মতো সুযোগ-সুবিধাগুলো জনগণের প্রতি রাষ্ট্রের কোনো করুণা বা দয়া নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের পরম দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবেই ভবিষ্যতে আলাদা আলাদা সব কার্ডের সমন্বয়ে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালু করা হবে। এর ফলে নাগরিকরা একটি একক পরিচয়ের মাধ্যমে সরকারের সব ধরনের কল্যাণমুখী সুযোগ-সুবিধা সহজেই লাভ করতে পারবেন।
সংসদে বিরোধীদলীয় একজন সংসদ সদস্য নিজ এলাকায় ফ্যামিলি কার্ড চালুর বিষয়ে জানতে চাওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রান্তিক মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে সরকারি ও বিরোধী দলকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কল্যাণমূলক কর্মসূচির বিষয়ে এমন জাতীয় ঐকমত্য তৈরি হওয়া অত্যন্ত ইতিবাচক লক্ষণ।
কৃষিখাত নিয়ে বিশদ আলোচনা করতে গিয়ে নিজেকে একজন কৃষকের সন্তান হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ দেশের অধিকাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে জড়িত। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া সামগ্রিক উন্নয়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
তিনি সংসদকে অবহিত করে বলেন, নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, সরকার গঠনের প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকেই ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ থাকা প্রায় ১৩ লাখ প্রান্তিক কৃষকের সুদসহ সম্পূর্ণ বকেয়া ঋণ মওকুফ করে দেওয়া হয়েছে। এটি কোনো কাগুজে পরিকল্পনা নয়, বরং মাঠপর্যায়ে কৃষকরা ইতোমধ্যেই এর সুফল ভোগ করতে শুরু করেছেন।
দেশের ঋণনির্ভর অর্থনীতিকে একটি টেকসই বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের রূপরেখা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, বিগত স্বৈরাচারী আমলে প্রতি বছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে, যা দেশের সার্বিক অবকাঠামো ও জনজীবনকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বর্তমান সরকার যেকোনো মূল্যে এই দুর্নীতির পথ চিরতরে বন্ধ করতে বদ্ধপরিকর। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে সরকার দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। দেশের বিশাল কর্মক্ষম জনশক্তিকে যুব সম্পদে রূপান্তর করতে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ১০ লাখ এবং ব্লু-ইকোনমি ও ইকোটুরিজম খাতে আরও ১০ লাখসহ উৎপাদনশীল বিভিন্ন খাতে পর্যায়ক্রমে ৯ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আগামী পাঁচ বছরে স্বেচ্ছাশ্রম ও সরকারি উদ্যোগে দেশজুড়ে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ বা সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টির এক বিশাল মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশে ১০ হাজার নতুন নার্সারি উদ্যোক্তা তৈরি হবে এবং নতুন করে আড়াই লাখ তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, স্বাধীনতার পর যাদের মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের একটি সঠিক ও নিরপেক্ষ পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করার দায়িত্ব ছিল, তারা তা না করে রাজনীতি টেনে এনেছিল। বর্তমান সরকার নিবিড় গবেষণার ভিত্তিতে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে, যার মাধ্যমে শহীদদের আত্মত্যাগের যথাযথ স্বীকৃতি প্রদান সম্ভব হবে।
শিক্ষা ও খেলাধুলা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জানান, আগামী বছর থেকে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘প্রাইম মিনিস্টার গোল্ডকাপ’ শুরু করা হচ্ছে, যা পর্যায়ক্রমে মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতেও চালু হবে। ঢাকা সিটি করপোরেশনসহ দেশজুড়ে খেলার মাঠ ও পার্কগুলো থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নের লক্ষ্যে বে টার্মিনাল বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি বন্দরকে সম্পূর্ণরূপে দুর্নীতিমুক্ত করার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
বক্তব্যের শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জুলাই সনদ’ ও ৩১ দফা রূপরেখা বাস্তবায়নের মাধ্যমে শহীদদের রক্তঋণ শোধ করে একটি বৈষম্যহীন, উগ্রবাদমুক্ত এবং প্রকৃত গণতান্ত্রিক কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠা করা হবে।


আপনার মতামত লিখুন :