ঢাকা রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬, ১০ শ্রাবণ ১৪৩৩
Daily Global News

অকার্যকর তালাকের অজুহাতে স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণ বন্ধ করা যাবে না

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: জুলাই ১৬, ২০২৬, ০১:৪৬ পিএম

অকার্যকর তালাকের অজুহাতে স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণ বন্ধ করা যাবে না

আইন অনুযায়ী প্রমাণিত বা কার্যকর নয় এমন তালাকের অজুহাতে কোনোভাবেই স্ত্রী ও নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ কিংবা দেনমোহরের ডিক্রির বাস্তবায়ন বন্ধ করা যাবে না বলে এক যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে আদালত অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ মা-বাবার তালাক সংক্রান্ত বিরোধের ওপর নির্ভরশীল নয়; এটি শিশুর সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বতন্ত্র একটি আইনগত অধিকার। সম্প্রতি হাইকোর্টের বিচারপতি আবদুর রহমানের একক বেঞ্চ এই রায় প্রদান করেন। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) এই রায়ের অনুলিপি প্রকাশ করা হয়।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১১ সালে পক্ষদ্বয়ের বিবাহ সম্পন্ন হয়। পরবর্তীতে স্ত্রী তাঁর নিজের ও নাবালক কন্যা সন্তানের পক্ষে দেনমোহর ও ভরণপোষণের জন্য পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করেন। শুনানিকালে স্বামী দাবি করেন যে তিনি পূর্বেই স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন, কিন্তু ফ্যামিলি কোর্টে তিনি আইন অনুযায়ী সেই তালাকের বৈধতা প্রমাণ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন। ফলশ্রুতিতে আদালত স্ত্রী ও সন্তানের পক্ষে দেনমোহর ও ভরণপোষণের ডিক্রি প্রদান করেন।

পরবর্তীতে স্বামী নতুন একটি ঘোষণামূলক মামলা দায়ের করে দাবি করেন যে তার তালাক কার্যকর হয়েছে এবং সেই মামলার অজুহাতে তিনি পূর্ববর্তী ডিক্রির এক্সিকিউশন বা বাস্তবায়ন স্থগিত করার আবেদন করেন। নিম্ন আদালত তার সেই আবেদন খারিজ করে দিলে বিষয়টি হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়ায়।

রায়ে হাইকোর্ট দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানান, শুধুমাত্র একটি নতুন মামলা দায়ের করা হয়েছে, এই অজুহাতে পূর্বে প্রদত্ত চূড়ান্ত ডিক্রির বাস্তবায়ন কোনোভাবেই বন্ধ করা যাবে না। কোনো সক্ষম আদালত ডিক্রি স্থগিত না করা পর্যন্ত সেটি কার্যকর থাকবে এবং এক্সিকিউশন কোর্ট তা বাস্তবায়ন করতে আইনত বাধ্য।

আদালত আরও স্পষ্ট করেন যে, যে তালাক আইন অনুযায়ী প্রমাণিত বা কার্যকর নয়, তার কোনো আইনগত ভিত্তি বা কার্যকারিতা নেই। এ ধরনের তালাক বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটায় না এবং ভরণপোষণ বা দেনমোহরের ডিক্রি বাস্তবায়নের পথে কোনো আইনি বাধাও সৃষ্টি করতে পারে না। রায়ে পুনরায় নিশ্চিত করা হয় যে, বিবাহ, তালাক, দেনমোহর এবং ভরণপোষণ সম্পর্কিত যেকোনো বিরোধ নিষ্পত্তির একমাত্র একচ্ছত্র এখতিয়ার কেবল ফ্যামিলি কোর্টের।

রায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নাবালক সন্তানের অধিকার নিয়ে আদালতের দৃঢ় অবস্থান। হাইকোর্ট বলেন, একজন নাবালক সন্তানের ভরণপোষণের অধিকার একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বতন্ত্র আইনগত অধিকার। মা-বাবার মধ্যে তালাক নিয়ে বিরোধ থাকলেও কোনোভাবেই সন্তানের ভরণপোষণ বন্ধ রাখা যাবে না এবং একজন পিতা তালাকের অজুহাত দেখিয়ে তাঁর সন্তানের ভরণপোষণের আইনি দায়িত্ব এড়াতে পারেন না।

এছাড়া আদালত পর্যবেক্ষণে জানান, যদি স্বামী সত্যিই বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটাতে চান, তবে আইন অনুযায়ী নতুন করে তালাক দেওয়ার সুযোগ তাঁর রয়েছে। তবে সেই সম্ভাবনা পূর্বে প্রদত্ত ডিক্রির অধীনে সৃষ্ট দেনমোহর ও বকেয়া ভরণপোষণের দায় থেকে তাঁকে কখনোই মুক্তি দেয় না।

চূড়ান্ত আদেশে হাইকোর্ট স্বামীর রুল খারিজ করে নিম্ন আদালতের আদেশ বহাল রাখেন এবং স্বামীকে অবিলম্বে দেনমোহরের বকেয়া ও স্ত্রী-সন্তানের সকল বকেয়া ভরণপোষণ পরিশোধের কড়া নির্দেশ দেন। আদালতে স্বামীর পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. শহিদুল ইসলাম এবং স্ত্রীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ইশরাত হাসান।

স্ত্রীর পক্ষের আইনজীবী ইশরাত হাসান এই রায়কে পারিবারিক আইনের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, এই রায় নারী ও শিশুর আইনি অধিকার সুরক্ষা এবং পারিবারিক আদালতের চূড়ান্ত রায়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!