বাংলাদেশের ইতিহাসে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের মতো বিতর্কিত মেগা প্রকল্প খুব কমই দেখা গেছে। রাজবাড়ীর পাংশায় পদ্মা নদীর ওপর ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ব্যারাজ নির্মাণে প্রায় ৩৩,৪৭৪ কোটি টাকা ব্যয় হবে বলে প্রাথমিক প্রস্তাবে জানানো হয়েছে। সরকারের দাবি, এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, সেচ, নৌচলাচল ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে বিপ্লব আনবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলছেন এটি কি সত্যিই দেশের কল্যাণে কাজ করবে, নাকি পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য নতুন বিপর্যয় ডেকে আনবে?
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব অনুযায়ী, পদ্মা ব্যারাজ প্রায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করবে। এর ফলে ২৯ লাখ হেক্টর জমি সেচের আওতায় আসবে, বছরে অতিরিক্ত ২৪ লাখ টন ধান উৎপাদন সম্ভব হবে, এবং ২.৩৪ লাখ টন মাছ উৎপাদন বাড়বে। ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বৈদ্যুতিক শক্তি পাওয়া যাবে। ফারাক্কা ব্যারাজের উজানি প্রভাব থেকে মুক্তি এবং নৌচলাচল সহজ হবে এই স্বপ্নটি শুনতে অবশ্যই আকর্ষণীয়।
কিন্তু এই চিত্রের উজ্জ্বল দিকটির পাশাপাশি অন্ধকার দিকগুলো সম্পর্কে কি যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে? প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উত্থাপিত হলেও বিস্তারিত সমীক্ষা ও পরিবেশ প্রভাব মূল্যায়নের প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত।
পদ্মা বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নদী দেশের জল পরিবহন, মৎস্য সম্পদ, জলবায়ু নিয়ন্ত্রণের মূল চালিকাশক্তি। এই নদীতে ব্যারাজ তৈরি করলে কী হবে?
প্রথমত, পদ্মার প্রাকৃতিক প্রবাহ ব্যাহত হবে। বর্ষাকালে বন্যা নিয়ন্ত্রণের দাবি থাকলেও শুষ্ককালে নিচুমুখী এলাকায় পানি সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফারাক্কার অভিজ্ঞতা আমরা দেখেছি যেখানে উজানি ব্যারাজ নিচু এলাকাকে শুষ্ক করে দিয়েছে।
দ্বিতীয়ত, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি। পদ্মা হাটিল-ইলিশের জন্মভূমি। ব্যারাজের ফিশ পাস থাকলেও মৎস্যপ্রবাহ বন্ধ হয়ে হাজারো মৎস্যজীবী পরিবারের জীবিকা বিপন্ন হবে। পদ্মার পাশে অবস্থিত চরাঞ্চল, ভোলা, বরিশালের জলবায়ু ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।
তৃতীয়ত, ভূগর্ভস্থ পানির ক্ষতি। পদ্মার পানি সংরক্ষণের বদলে নিয়ন্ত্রণ করলে নিচু এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নামবে, যা কৃষি ও পানি সরবরাহের জন্য নতুন সংকট তৈরি করবে।
৩৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় এই অর্থ দিয়ে অনেক কিছু করা সম্ভব। প্রকল্পের দাবি করা লাভগুলোর বাস্তবতা যাচাই করা হয়নি। উদাহরণস্বরূপ, ২৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচের দাবি কিন্তু পদ্মা থেকে এত পানি সংগ্রহ ও বিতরণের অবকাঠামো কোথায়? বিদ্যুৎ উৎপাদন ১১৩ মেগাওয়াট যা দেশের মোট চাহিদার একটি ছোট অংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রকল্পের পরিবেশগত ও সামাজিক ক্ষতির হিসাব যোগ করলে লাভের চেয়ে ক্ষতি অনেক বেশি হতে পারে। ছয় দশকের আলোচনার পরও বিস্তারিত সমীক্ষা ছাড়া এগিয়ে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।
পদ্মা সেতু নির্মাণের সময়ও অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যানজট কমবে, অর্থনীতি উন্নত হবে। কিন্তু বাস্তবে সেতুর চারপাশে নতুন যানজট, অবৈধ দখল, পরিবেশ ক্ষতি দেখা দিয়েছে। ব্যারাজের ক্ষেত্রেও একই ভুল পুনরাবৃত্তি হলে দেশের ক্ষতি হবে।
বিকল্প কী আছে?
পদ্মা ব্যারাজের বদলে পরিবেশবান্ধব বিকল্প নিয়ে চিন্তা করা যেতে পারে:
নদীভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা: ব্যারাজ ছাড়াই পদ্মার পানি সংরক্ষণ ও বিতরণ।
ছোট ছোট রিজার্ভোয়ার: বড় ব্যারাজের বদলে ছোট স্থানীয় সেচ ব্যবস্থা।
আন্তর্জাতিক কূটনীতি: ফারাক্কা ব্যারাজ নিয়ে ভারতের সঙ্গে পানিভাগাভাগি চুক্তি।
জলবায়ু-সহনশীল কৃষি: বন্যা-শুষ্কতা সহনশীল ফসল চাষ।
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু তাড়াহুড়োয় সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। পরিবেশ প্রভাব মূল্যায়ন, সামাজিক প্রভাব বিশ্লেষণ, এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে এগোতে হবে। ৩৩ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের আগে দশবার ভেবে দেখতে হবে এটি কি সত্যিই দেশের কল্যাণে কাজ করবে, নাকি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নতুন বোঝা হয়ে থাকবে?
পদ্মা বাংলাদেশের জীবনরেখা। এই নদীকে রক্ষা করাই আমাদের প্রধান দায়িত্ব। ব্যারাজ নির্মাণের নামে সেই জীবনরেখাকে বিপন্ন করা যাবে না। সরকারের উচিত পরিকল্পিত, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং স্বচ্ছভাবে এগিয়ে যাওয়া। নইলে পদ্মা ব্যারাজ শুধু অর্থনৈতিক প্রকল্প নয়, পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী


আপনার মতামত লিখুন :