ঢাকা শনিবার, ৩০ মে, ২০২৬, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
Daily Global News

ইসলামে যেভাবে কোরবানি প্রথার সূচনা

ধর্ম ডেস্ক

প্রকাশিত: মে ২৭, ২০২৬, ০৭:২২ পিএম

ইসলামে যেভাবে কোরবানি প্রথার সূচনা

মানব ইতিহাসের সূচনা থেকেই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে কোরবানি প্রথার প্রচলন রয়েছে। ইসলামের ইতিহাস অনুযায়ী, প্রথম মানব হযরত আদম (আ.) এবং পরবর্তীতে হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সময় থেকেই পশু কোরবানির রীতি চালু ছিল। তবে বর্তমান মুসলিম উম্মাহ যেভাবে ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ উদযাপন করে, তা মূলত বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মদিনায় হিজরতের পর প্রাতিষ্ঠানিক ও পারিভাষিক রূপ লাভ করে।

ইসলামী চিন্তাবিদ ও ইতিহাসবিদদের মতে, মক্কায় ইসলামের প্রাথমিক যুগেও আরবের বাসিন্দারা প্রতি বছর কোরবানি দিত। তবে তারা সেসব পশু উৎসর্গ করত বিভিন্ন দেব-দেবীর নামে। ফলে একাত্মবাদের প্রচারক হযরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কায় অবস্থানকালীন সময়ে মক্কার পৌত্তলিকদের সেই বহুত্ববাদী রীতি অনুসরণ করেননি। নবুয়ত প্রাপ্তির দীর্ঘ ১৩ বছর পর মদিনায় হিজরতের পরই মূলত ইসলামে আনুষ্ঠানিকভাবে কোরবানির বিধান কার্যকর হয়।

মক্কা ও মদিনা জীবনের বিধিবিধানের পার্থক্য: ইসলামিক ফাউন্ডেশনের হালাল সনদ বিভাগের উপ-পরিচালক মাওলানা মো. আবু ছালেহ পাটোয়ারী এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বলেন, “ইসলামের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিধিবিধান রাসুল (সা.) মদিনায় আসার পর কার্যকর হয়েছে। কারণ মক্কী জীবনে রাসুল (সা.)-এর প্রাথমিক কাজ ছিল মানুষের অন্তরে একাত্মবাদ বা তাওহিদ প্রতিষ্ঠা করা। বিশ্বাসের ভিত মজবুত হওয়ার পর মদিনায় হিজরতের পর থেকে ইসলামের বিভিন্ন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিধিবিধান জারি হতে থাকে।”

ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, হিজরি দ্বিতীয় সনে মুসলমানদের জন্য রোজা এবং ঈদুল ফিতরের প্রবর্তন করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক মো. আতাউর রহমান মিয়াজী জানান, সাহাবী হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস অনুযায়ী মদিনায় যাওয়ার পর রাসুল (সা.) দেখলেন সেখানকার মানুষ বছরে ‘নওরোজ’ ও ‘মিহিরজান’ নামে দুটি বড় উৎসব পালন করে। তখন ওই উৎসব দুটির পরিবর্তে মুসলমানদের জন্য সম্পূর্ণ নিজস্ব ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধসম্পন্ন দুটি জাতীয় উৎসব (ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা) পালনের ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন তিনি।

প্রথম কোরবানির ইতিহাস ও পবিত্র কোরআনের নির্দেশনা: রাসুল (সা.) মদিনায় আসার পর ঠিক কোন দিন প্রথম কোরবানি দিয়েছিলেন, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে সামান্য মতভিন্নতা থাকলেও পবিত্র কোরআনের সুরা কাওসার এবং সুরা হজে কোরবানি করার স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এর মধ্যে সুরা কাওসারটি রাসুল (সা.) মক্কায় থাকার সময়ই নাজিল হয়েছিল, যা প্রমাণ করে কোরবানির ধারণা ইসলামের শুরু থেকেই ছিল।

হাদিস গ্রন্থ তিরমিজির উদ্ধৃতি দিয়ে মাওলানা আবু ছালেহ পাটোয়ারী জানান, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেছেন, হিজরতের পর রাসুল (সা.) মদিনায় যে ১০ বছর অবস্থান করেছিলেন, তার প্রতিটি বছরই তিনি কোরবানি সম্পন্ন করেছেন। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, রাসুল (সা.) দুটি শিংওয়ালা নাদুস-নুদুস দুম্বা নিজ হাতে জবাই করতেন এবং বলতেন, “একটি আমার নিজের ও পরিবারের পক্ষ থেকে এবং অপরটি আমার উম্মতের পক্ষ থেকে।”

হজ কেন্দ্রিক কোরবানি ও ‘হাদি’র ইতিহাস: প্রাথমিক যুগে কোরবানির বিষয়টি ছিল অনেকটাই মক্কা ও হজ কেন্দ্রিক। যারা দূর-দূরান্ত থেকে হজ বা ওমরাহ করতে মক্কায় যেতেন, তারা কোরবানির জন্য উট বা দুম্বার মতো পশু সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন। আরবে এই উৎসর্গীকৃত পশুগুলোকে বলা হতো ‘হাদি’।

অধ্যাপক মো. আতাউর রহমান মিয়াজী জানান, ষষ্ঠ হিজরিতে (৬২৮ খ্রিস্টাব্দে) রাসুল (সা.) যখন ১৪শ সাহাবীকে সাথে নিয়ে ওমরাহর উদ্দেশ্যে রওনা হন, তখন মক্কার কুরাইশরা তাদের হুদাইবিয়ায় বাধা দেয়। পরে সেখানে ঐতিহাসিক ‘হুদাইবিয়ার সন্ধি’ চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে রাসুল (সা.) মক্কায় প্রবেশ না করেই হুদাইবিয়ার প্রান্তরে নিজের ও পরিবারের জন্য উট কোরবানি দেন। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, সেই সফরে তিনি ৬৩টি উট কোরবানি করেছিলেন।

সে সময় নিয়ম ছিল, ওমরাহ বা হজের জন্য নিয়ে যাওয়া পশুগুলোর সিনায় সামান্য কেটে বিশেষ দাগ লাগিয়ে দেওয়া হতো, যাতে দূর থেকে দেখলেই সবাই বুঝতে পারে এগুলো আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গের জন্য নিয়ে যাওয়া ‘কোরবানির পশু’ বা হাদি।

পরবর্তীতে নবম হিজরিতে হযরত আবু বকর (রা.)-এর নেতৃত্বে একদল সাহাবীকে হজের জন্য পাঠানো হয় এবং তাদের সাথেও হাদির পশু ছিল। তবে দশম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের পর রাসুল (সা.) যখন নিজে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় হজ সম্পাদন করেন, তখন তিনি মক্কার মাটিতে দাঁড়িয়ে ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে বৃহৎ ও স্মরণীয় আনুষ্ঠানিক কোরবানিটি সম্পন্ন করেছিলেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে মুসলিম উম্মাহ অত্যন্ত জাঁকজমক ও ধর্মীয় মর্যাদার সাথে পবিত্র ঈদুল আজহায় পশু কোরবানির এই ধারা অব্যাহত রেখেছে।

 

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!