ঢাকা শনিবার, ৩০ মে, ২০২৬, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
Daily Global News

কলকাতায় কঠোর বিধিনিষেধে ভিন্নধর্মী ঈদ

ডিজিএন ডেস্ক

প্রকাশিত: মে ২৮, ২০২৬, ১০:১৮ পিএম

কলকাতায় কঠোর বিধিনিষেধে ভিন্নধর্মী ঈদ

“ছেলেবেলায় বাবার সঙ্গে রেড রোডে নামাজ পড়তে আসতাম। আমার তখন ১০ বছর বয়স হবে। ব্রিগেডে অনেকটা জায়গা আছে। কিন্তু কী জানেন, ঈদের সকালে রেড রোডে নামাজ পড়াটা অভ্যেসের মতো ছিল,” কিছুটা নস্টালজিয়া আর মন খারাপ মেশানো কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন কলকাতার প্রবীণ বাসিন্দা মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন।

কলকাতার প্রাণকেন্দ্র রেড রোডের চেনা চত্বর ছেড়ে আজ বৃহস্পতিবার (২৮ মে) মহানগরের কোরবানির ঈদের মূল জামাত অনুষ্ঠিত হলো ঐতিহাসিক ‘ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড’-এ। পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকারের নেওয়া বেশ কিছু নজিরবিহীন প্রশাসনিক পদক্ষেপের মধ্যে এটি অন্যতম। রাস্তা আটকে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বন্ধ করার নীতিগত সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবেই মূলত এই স্থান পরিবর্তন। এর পাশাপাশি ১৯৫০ সালের প্রাণিসম্পদ আইন কঠোরভাবে বলবৎ করা এবং জেলাগুলোতে মসজিদের বাইরে কড়া পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর নজরদারির মধ্য দিয়ে এবার রাজ্যে একটি ‘ভিন্নধর্মী’ পরিবেশে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হলো।

কলকাতার ঈদের নামাজের মূল আয়োজক ‘ক্যালকাটা খিলাফত কমিটি’। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তারা রেড রোডেই ঈদের জামাত করে আসছিল। তবে গত বছর থেকেই এই রাস্তাটির অভিভাবকত্ব থাকা ভারতীয় সেনাবাহিনী ট্র্যাফিক ও নিরাপত্তার স্বার্থে রেড রোডে নামাজ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর হস্তক্ষেপে গত বছর অনুমতি মিললেও, এবার কলকাতা পুলিশ আয়োজকদের আগেই বিকল্প জায়গা খুঁজতে বলে। শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনীর অনুমতি সাপেক্ষে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডকে বেছে নেওয়া হয়।

কমিটির কর্মকর্তা মোহাম্মদ খলিল বিবিসি বাংলাকে বলেন, “অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার ব্রিগেডে মানুষের উপস্থিতি কিছুটা কম। অনেকে ভেবেছেন নতুন জায়গায় কোনো সমস্যা হবে কি না। আবার অনেকে গরু কোরবানির বিধিনিষেধের কারণে এবার ঈদে অন্যত্র চলে গেছেন।”

তবে নামাজে অংশ নেওয়া নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ফারুক বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখে বলেন, “এখানে একটা বড় সুবিধা হলো জায়গার অভাব নেই। আগে রেড রোডে সকাল সকাল এসে জায়গা ঠিক করতে হতো, গাড়ি চলাচলেও অসুবিধা হতো।”

নতুন সরকারের আরেকটি বড় পদক্ষেপ হলো ১৯৫০ সালের ‘প্রাণিসম্পদ আইন’ কঠোরভাবে বলবৎ করা। এই আইন অনুযায়ী গরু, মহিষ, ষাঁড় বা বলদ জবাইয়ের ক্ষেত্রে পশুর বয়স ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সরকারি শংসাপত্র (সার্টিফিকেট) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই সাথে পৌরসভা বা প্রশাসন নির্ধারিত কসাইখানার বাইরে প্রকাশ্যে পশু জবাইয়ের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

সরকারের এই আকস্মিক আইনি কড়াকড়ির সরাসরি প্রভাব পড়েছে কোরবানির পশুর হাটে। ব্যবসায়ী ও ক্রেতা-উভয় পক্ষই জানিয়েছেন, আইনি জটিলতা বা পুলিশি হয়রানির ভয়ে অনেকেই এবার গরু কেনাবেচা করতে সাহস পাননি। ফলে চলতি বছর গরুর বাজারে বড় ধরনের ভাঁটা লক্ষ্য করা গেছে।

বিগত তৃণমূল সরকারের আমলে বিশেষ করে রোজার ঈদে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী ও অভিষেক ব্যানার্জীকে রেড রোডের ঈদের মঞ্চে নিয়মিত উপস্থিত থাকতে দেখা যেত। সেখান থেকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তার পাশাপাশি প্রায়শই বিরোধীদের নিশানা করে কড়া রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া হতো, যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক কম হয়নি। ১৯৭৭ থেকে ২০১১ পর্যন্ত বাম আমলেও এমন নজির ছিল না।

তবে এবারের ব্রিগেডের ধর্মীয় জমায়েত ছিল সম্পূর্ণ ‘রাজনৈতিক রঙ’ মুক্ত। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী দুজনই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুভেচ্ছা বার্তা দিয়েই নিজেদের দায়িত্ব সেরেছেন। ঈদে অংশ নেওয়া দক্ষিণ ২৪ পরগণার খলিল আহমেদ বিষয়টিকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, “সবাই নামাজ আর কোরবানির কথা বলছে, পজিটিভ পরিবর্তনও তো আছে। এই প্রথম ঈদের নামাজের অনুষ্ঠানকে কেউ রাজনৈতিক কারণে ব্যবহার করেনি।”

তবে উৎসবের শান্ত পরিবেশের মধ্যেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসনের কড়া নজরদারি সাধারণ মানুষের মনে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি করেছে। কলকাতার টিপু সুলতান মসজিদসহ বিভিন্ন জেলা ও মফস্বলের মসজিদের বাইরে বিপুল পরিমাণ পুলিশ ও সিআরপিএফ জওয়ানদের অস্ত্রহাতে টহল দিতে দেখা গেছে। নরেন্দ্রপুরের বাসিন্দা মহিউদ্দিন লস্কর বলেন, “এলাকায় সম্পূর্ণ শান্তি ছিল, তবু এত সিআরপিএফ কেন পাঠানো হলো মাথায় ঢুকলো না।”

এদিকে কলকাতার তপসিয়ার টালিখোলা মসজিদ সংলগ্ন বাসিন্দাদের জন্য এবারের ঈদ ছিল চরম বিষাদের। সম্প্রতি সেখানকার একটি অবৈধ ভবনের চামড়ার কারখানায় ভয়াবহ আগুনে ২ জন কর্মীর মৃত্যু হয়। এরপরই সরকারের নির্দেশে ওই বহুতল ও লাগোয়া ভবনগুলো ভেঙে ফেলার প্রক্রিয়া শুরু হয়। হাইকোর্টের হস্তক্ষেপে ভাঙার কাজ সাময়িক স্থগিত হলেও, বাসিন্দাদের ঘর ছাড়তে হয়েছে।

ঈদের দিনেও ওই পরিত্যক্ত ভবনের নিচে আতরের দোকান খোলা রাখা মোহাম্মদ জুনেইদ বলেন, “অন্যান্য বছর এই রাস্তায় ঈদের দিনে ভিড় উপচে পড়ত। এবার লোক নেই। এই বাড়িতে অনেকগুলো পরিবার থাকত, আজ তারা কোথায়, কী অবস্থায় ঈদ কাটাচ্ছে কেউ জানে না।”

রাস্তাঘাট ফাঁকা, ট্র্যাফিক জ্যাম নেই, বড় মাঠে সুশৃঙ্খল নামাজ সবকিছু ঠিকঠাক থাকার পরও কলকাতার মুসলিম কমিউনিটির সাধারণ মানুষের মাঝে কোথাও যেন একটা চাপা শূন্যতা। মল্লিক বাজারে নামাজ শেষে ছেলের হাত ধরে হাঁটা মোহাম্মদ হুসেনের কথাতেই তা স্পষ্ট, “আজ রাস্তাঘাটে ভিড় নেই ঠিকই, কিন্তু কিছু একটা যেন মিসিং। আগের মতো সেই চেনা আমেজটা আর নেই।”

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!