ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিল সর্বশেষ ২০০২ সালে বিশ্বসেরার মুকুট মাথায় তুলেছিল। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ ২৪ বছর। প্রতি আসরেই `হেক্সা` বা ষষ্ঠ শিরোপার স্বপ্ন নিয়ে মিশন শুরু করলেও সেলেসাওদের সেই স্বপ্ন বারবার চূর্ণ হয়েছে নকআউট পর্বে ইউরোপীয় দলগুলোর কাছে এসে। চলতি আসরে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে এবং দ্বিতীয় রাউন্ডে জাপানকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে আবারও সেই চেনা প্রাচীরের সামনে দাঁড়িয়ে ল্যাটিন আমেরিকান পরাশক্তিরা।
আজ ৫ জুলাই (বাংলাদেশ সময় ৬ জুলাই, সোমবার রাত ২টা) নিউ ইয়র্কের নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে নরওয়ের মুখোমুখি হচ্ছে ব্রাজিল। এই ম্যাচে জিততে হলে ভিনিসিয়ুসদের শুধু নরওয়ে নয়, নিজেদের গত পাঁচ আসরের অভিশপ্ত ইতিহাসকেও হারাতে হবে।
ইতিহাস বলছে, ২০০২ সালের পর প্রতিবারই নকআউট পর্বে ইউরোপের দলের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছে ব্রাজিল। ২০০৬ সালে ফ্রান্সের কাছে ১-০, ২০১০ সালে নেদারল্যান্ডসের কাছে ২-১, ২০১৪ সালে নিজেদের মাটিতে জার্মানির কাছে ৭-১, ২০১৮ সালে বেলজিয়ামের কাছে ২-১ এবং সর্বশেষ ২০২২ কাতারে ক্রোয়েশিয়ার কাছে টাইব্রেকারে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নদের।
এমনকি নরওয়ের বিপক্ষে ব্রাজিলের অতীত রেকর্ডও সুখকর নয়। এ পর্যন্ত দলটির মুখোমুখি হয়ে ৪ ম্যাচের একটিতেও জিততে পারেনি ব্রাজিল (২ হার, ২ ড্র)। বিশ্বকাপে তাদের একমাত্র দেখায় ১৯৯৮ আসরে ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়ে দিয়েছিল নরওয়ে।
এবারের আসরে নরওয়ে বেশ দুর্দান্ত ফর্মে আছে। ফ্রান্সের কাছে গ্রুপ ম্যাচে হারলেও সেনেগাল ও ইরাককে হারিয়ে তারা রানার্সআপ হয় এবং আগের রাউন্ডে আইভরি কোস্টকে ২-১ গোলে হারিয়ে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচ জয়ের কৃতিত্ব দেখায়।
নরওয়ের প্রধান অস্ত্র বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ড। তাঁর সাথে মার্টিন ওডেগার্ডের প্লে-মেকিং ও আলেকজান্ডার সোরলথের শারীরিক ফুটবল নরওয়ের আক্রমণভাগকে বিপজ্জনক করে তুলেছে। নরওয়ের প্রধান কৌশল হতে পারে ব্রাজিলের দুর্বল ফুলব্যাক পজিশন ব্যবহার করে উইং দিয়ে আন্তোনিও নুসা বা অস্কার ববকে দিয়ে কাউন্টার অ্যাটাক চালানো। তবে ফরাসিদের কাছে চার গোল খাওয়া নরওয়ের রক্ষণভাগ বেশ নড়বড়ে।
অন্যদিকে, মাস্টার ট্যাকটিশিয়ান কার্লো আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিল ধীরে ধীরে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে। জাপানের বিপক্ষে ১-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও দ্বিতীয়ার্ধে কৌশল বদলে ২-১ গোলের জয় তুলে নেয় তারা। দলের বর্তমান প্রাণভোমরা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র বাম প্রান্ত দিয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণে ত্রাস সৃষ্টি করছেন। তাঁর সাথে তরুণ এন্ড্রিক, রায়ান এবং জাপানের বিপক্ষে গোল করা মার্তিনেল্লি নরওয়ের রক্ষণ গুঁড়িয়ে দিতে প্রস্তুত।
মাঝমাঠে কাসেমিরো ও পাকেতার ইনজুরি চিন্তা থাকলেও ব্রুনো গিমারেস ইতিমধ্যে ৪টি অ্যাসিস্ট করে মিডফিল্ডের কাণ্ডারি হয়ে উঠেছেন। রক্ষণে আছেন গ্যাব্রিয়েল ও মার্কিনহোস। আর্সেনালের গ্যাব্রিয়েলের সাথে ম্যানচেস্টার সিটির হালান্ডের দ্বৈরথটি হবে দেখার মতো, যার পেছনে শেষ প্রহরী হিসেবে থাকছেন লিভারপুলের বিশ্বসেরা গোলরক্ষক অ্যালিসন বেকার। এছাড়া ইনজুরি কাটিয়ে মাত্র ১৪ মিনিট খেলা নেইমার জুনিয়রও যেকোনো মুহূর্তে তুরুপের তাস হতে পারেন। আনচেলত্তির সামনেও ইতিহাস গড়ার সুযোগ, কারণ বিশ্বকাপের ইতিহাসে কোনো বিদেশি কোচ আজ পর্যন্ত ট্রফি জিততে পারেননি।
আজকের অপর মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে স্বাগতিক মেক্সিকোর মুখোমুখি হচ্ছে থ্রি লায়ন্স বা ইংল্যান্ড। এই ম্যাচের ভেন্যু মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এজটেকা স্টেডিয়াম, যা ইংল্যান্ডের জন্য এক দুঃস্বপ্নের নাম। ঠিক ৪০ বছর আগে এই মাঠেই ডিয়েগো ম্যারাডোনা ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত দুটি গোল (হ্যান্ড অব গড এবং গোল অব দ্য সেঞ্চুরি) করেছিলেন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই মাঠে মেক্সিকো ৮৯টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে মাত্র ২টিতে হেরেছে এবং বিশ্বকাপের ১০টি ম্যাচের কোনোটিতেই তারা হারেনি। এছাড়া সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মেক্সিকো সিটির গড় উচ্চতা প্রায় সাড়ে সাত হাজার ফুট, যা পাতলা বাতাসে শ্বাস নেওয়ার ক্ষেত্রে ইংল্যান্ডের ফুটবলারদের জন্য বড় অস্বস্তির কারণ হবে।
স্বাগতিক মেক্সিকো চলতি আসরে উড়ছে। এখন পর্যন্ত চার ম্যাচের সবকটিতে জেতা দলটি একটি গোলও হজম করেনি। তাদের আক্রমণভাগে রাউল হিমেনেস ও হুলিয়ান কিনিওনেসের জুটি দারুণ কার্যকর। কোনো একক তারকার ওপর নির্ভর না করে মাঝমাঠের দ্রুত পাস ও উচ্চ গতির ট্রানজিশনের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখাই মেক্সিকোর প্রধান শক্তি।
বিপরীতে, ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় সম্পদ তাদের শক্তিশালী আক্রমণভাগ। অধিনায়ক হ্যারি কেইন এখনও দলের প্রধান গোলমুখী অস্ত্র, যিনি ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে প্রচণ্ড চাপে দুই গোল করে নিজের জাত চিনিয়েছেন। কেইনের পাশাপাশি জুড বেলিংহামের সৃজনশীলতা, বুকায়ো সাকার গতি, ফিল ফোডেনের টেকনিক এবং ডেকলান রাইসের মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ ইংল্যান্ডকে চরম ভারসাম্যপূর্ণ করে তুলেছে।
তবে ফুল-ব্যাকরা ওপরে উঠে গেলে ইংল্যান্ডের ডিফেন্সে যে ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়, মেক্সিকো সেই কাউন্টার অ্যাটাককে কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে। বেলিংহাম ও রাইস যদি মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারেন তবেই ইংল্যান্ড মেক্সিকোর দুর্গ ভাঙতে পারবে। সব মিলিয়ে একটি রুদ্ধশ্বাস ফুটবলীয় যুদ্ধ দেখার অপেক্ষায় বিশ্ব। আর এই ম্যাচের জয়ী দলই কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হবে ব্রাজিল বনাম নরওয়ে ম্যাচের বিজয়ীর সাথে।


আপনার মতামত লিখুন :