ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩
Daily Global News
ট্রাম্পের ফোনে লাল কার্ড মাফ!

ফিফা-হোয়াইট হাউস আঁতাতের কেলেঙ্কারিতে কাঁপছে ফুটবল বিশ্ব

স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশিত: জুলাই ৭, ২০২৬, ১২:১০ পিএম

ফিফা-হোয়াইট হাউস আঁতাতের কেলেঙ্কারিতে কাঁপছে ফুটবল বিশ্ব

বিশ্বকাপ ফুটবলের সহ-আয়োজক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তারকা স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞা নজিরবিহীনভাবে তুলে নিয়েছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। বিশ্বকাপের নিয়ম অনুযায়ী লাল কার্ডের বিরুদ্ধে আপিল করার কোনো আইনি সুযোগ না থাকলেও, ফিফার এই পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক ফুটবল মহলে এক বিশাল কেলেঙ্কারির জন্ম দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও অনুরোধেই ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এই বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা ফুটবল অঙ্গনে ফিফার নিরপেক্ষতাকে চরম প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

বেলজিয়ামের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের মহাগুরুত্বপূর্ণ শেষ ষোলোর ম্যাচের আগে বালোগানের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া নিয়ে সোমবার ফিফা ৮৭১ শব্দের একটি দীর্ঘ বিবৃতি দিলেও, এই নজিরবিহীন ক্ষমার কোনো স্পষ্ট কারণ ব্যাখ্যা করেনি।

ফিফার এই রহস্যময় ক্ষমার পেছনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সরাসরি স্বীকার করেন, "এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে আমিই ভূমিকা রেখেছি।" তবে ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি শুধু নিজের বন্ধু ইনফান্তিনোকে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করার অনুরোধ করেছিলেন, কোনো নির্দেশ দেননি।

ট্রাম্পের মতে, বসনিয়া-হার্জেগোভিনার বিপক্ষে লাল কার্ড পেয়ে ম্যাচের বাকি সময় মাঠের বাইরে থাকাটাই বালোগানের জন্য যথেষ্ট শাস্তি ছিল। তবে ট্রাম্পের এই অযাচিত হস্তক্ষেপ এবং ইনফান্তিনোর নমনীয়তা স্বাগতিক দেশের প্রতি চরম পক্ষপাতিত্বের প্রমাণ হিসেবে দেখছেন ফুটবল বোদ্ধারা।

সাবেক লিভারপুল কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "এটি আমাদের খেলা, তাদের (ট্রাম্প ও ইনফান্তিনো) নয়। যদি ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জিয়ান্নি ইনফান্তিনো নিজেদের মধ্যে কথা বলে লাল কার্ড মাফ করে দেন, তবে তা চরম পাগলামি। এতে পুরো ফুটবল ব্যবস্থার নিরপেক্ষতাই ধ্বংস হয়ে যায়।"

এমনকি দুর্নীতির দায়ে বহিষ্কৃত সাবেক ফিফা প্রধান সেপ ব্ল্যাটারও এক্সে (টুইটার) লিখেছেন, "ফুটবল কখনোই রাজনৈতিক ক্ষমতার খেলাঘর হয়ে উঠতে পারে না।"

ফিফার সংবিধানে স্পষ্টভাবে বলা আছে, ফুটবলে যেকোনো ধরনের সরকারি বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই নিয়মের কারণে গত আট বছরে পাকিস্তান ফুটবল ফেডারেশনকে তিনবার আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ (সাসপেন্ড) করেছে ফিফা। কিন্তু আমেরিকার ক্ষেত্রে ফিফার এই দ্বিমুখী নীতি ও নমনীয়তা সবাইকে স্তব্ধ করেছে।

ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা এক কড়া বিবৃতিতে বলেছে, ফিফা এবার সমস্ত নৈতিকতার ‘লাল রেখা’ অতিক্রম করেছে, যা নজিরবিহীন।

মূলত, ড্র অনুষ্ঠানে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বিতর্কিত ‘ফিফা পিস প্রাইজ’ দেওয়ার পর থেকেই ইনফান্তিনোর সাথে হোয়াইট হাউসের গভীর সম্পর্কের বিষয়টি স্পষ্ট হতে থাকে। মানবাধিকার সংগঠন ‘ফেয়ারস্কয়ার’ এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ৫০ জন সদস্য ফিফার এথিকস কমিটির কাছে ইনফান্তিনোর রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ভঙ্গের বিরুদ্ধে চিঠি লিখলেও ফিফা তা বরাবরের মতোই ধামাচাপা দিয়েছে। এর আগে সোমালিয়ার রেফারি ওমর আরতানকে মার্কিন অভিবাসন কর্মকর্তারা দেশে ঢুকতে না দিলে ইনফান্তিনো সাংবাদিকদের হালকা ছলে বলেছিলেন, “আরে, একটু শান্ত থাকুন, আরাম করুন।”

২০১৬ সালে সভাপতি হওয়ার পর থেকেই ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে একের পর এক বিতর্কের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ তিন মহাদেশে ছড়িয়ে দিয়ে ২০৩৪ আসরের আয়োজক হিসেবে মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ সৌদি আরবকে প্রায় নিশ্চিত করা এবং বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিতে ফুটবলারদের সংগঠন ‘ফিফপ্রো’র আপত্তি সত্ত্বেও নতুন করে ‘ক্লাব বিশ্বকাপ’ চালু করার পেছনে ইনফান্তিনোর অতি-বাণিজ্যিক মানসিকতা প্রকাশ পেয়েছে। টিকিট মূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি নিয়ে উয়েফার সাথে ফিফার দ্বন্দ্ব এখন চরমে।

আগামী ২০২৭ সালের ফিফা কংগ্রেসে টানা ১০ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করা জিয়ান্নি ইনফান্তিনো আবারও সভাপতি পদে নির্বাচন করবেন। উয়েফা ও ইউরোপীয় দেশগুলো তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও ইনফান্তিনোর ক্ষমতা ও ভোট ব্যাংক এখনো নিরেট পাথরের মতো শক্তিশালী।

ইনফান্তিনো মূলত ‘ফিফা ফরোয়ার্ড’ কর্মসূচির মাধ্যমে অর্থায়ন বাড়িয়ে এবং বিশ্বকাপের দল সংখ্যা ৩২ থেকে বাড়িয়ে ৪৮ করে উয়েফার বাইরের অঞ্চলগুলোর মন জয় করেছেন। এর ফলে কেপ ভার্দে, কুরাসাও, জর্ডান ও উজবেকিস্তানের মতো ছোট ছোট দেশগুলো প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন দেখছে।

ফিফার ২১১টি সদস্য দেশের মধ্যে নির্বাচনে জিততে প্রয়োজন ১০৬টি ভোট। ইতিমধ্যে দক্ষিণ আমেরিকার ১০টি, আফ্রিকার ৫৪টি এবং এশিয়ার ৪৭টি দেশ অর্থাৎ মোট ১১১টি দেশ প্রকাশ্যেই ইনফান্তিনোকে সমর্থন দিয়ে রেখেছে। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লাল কার্ড কেলেঙ্কারি বা উয়েফার তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও ২০২৭ সালের নির্বাচনে জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ফিফার সিংহাসন থেকে সরানো প্রায় অসম্ভব। সূত্র: বিবিসি

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!