"বিয়ের পর যখন এই বাড়িতে এসেছিলাম, তখন আমাদের ঘর ছিল তিস্তা নদীর মাঝামাঝি। একে একে সব শেষ হয়ে গেছে। আটবার আমাদের ঘর ভেঙেছে। এখন আর জানি না কতবার ঘর হারালে সরকার আমাদের জন্য একটা স্থায়ী বাঁধ দেবে।" কথাগুলো বলতে বলতেই কান্নায় গলা ধরে আসে ষাটোর্ধ্ব অফেজা বেগমের।
নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ঝুনাগাছ চাপানি ইউনিয়নের পশ্চিম ছাতুনামা গ্রামের কেল্লাপাড়া এলাকার বাসিন্দা তিনি। স্বামী তোয়াল উদ্দিনের সঙ্গে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তিস্তার রাক্ষুসে ভাঙনের বিরুদ্ধে নিরন্তর যুদ্ধ করে চললেও জয় মেলেনি কখনোই। নদী বারবার কেড়ে নিয়েছে তাদের ঘর, আঙিনা, ফসলি জমি আর বেঁচে থাকার সব স্বপ্ন।
অফেজা বেগমের মতো কেল্লাপাড়া ও এর আশপাশের অসংখ্য মানুষের জীবন যেন তিস্তার স্রোতের সঙ্গেই বাঁধা। বর্ষা এলেই ভাঙন আতঙ্কে তাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। সম্প্রতি তিস্তার পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার পর, এখন পানি কমতেই শুরু হয়েছে তীব্র নদীভাঙন।
চোখের সামনে বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হতে দেখে অনেকেই দ্রুত ঘরবাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। এরই মধ্যে অন্তত পাঁচটি পরিবারের ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ নদীতে তলিয়ে গেছে। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দিশেহারা মানুষগুলোর দিন কাটছে চরম দুর্বিষহ অবস্থায়। চুলোয় আগুন না জ্বলায় শুকনা খাবার খেয়ে দিন পার করছেন অনেকে। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি, খাদ্য ও চিকিৎসার তীব্র সংকট।
স্থানীয় বাসিন্দাদের এখন একটাই দাবি ত্রাণ নয়, চাই তিস্তার স্থায়ী বাঁধ। স্থানীয় আমেনা বেগম আক্ষেপ করে বলেন, তিস্তাপাড়ের মানুষের কষ্টের কোনো শেষ নেই। বর্ষা এলে আতঙ্কে তাদের ঘুম হয় না। বারবার ঘর ভাঙার পর তারা এখন শুধু সরকারের কাছে একটি স্থায়ী বাঁধ চান।
একই সুরে আবু তালেব বলেন, তিস্তাপাড়ের মানুষের কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তারা বারবার বসতভিটা ভাঙার সাক্ষী হয়েছেন, তাই এখন তাদের মূল দাবি তিস্তা মহাপরিকল্পনার দ্রুত বাস্তবায়ন।
আরেক বাসিন্দা রহিমা বেগমও জানান, বাকি জীবনটা নিশ্চিন্তে কাটানোর জন্য তাদের একটি বাঁধ খুবই জরুরি, কারণ বারবার নতুন করে ঘর বানানোর মতো আর্থিক বা শারীরিক শক্তি আর তাদের অবশিষ্ট নেই।
ভাঙন রোধে সরকারি পদক্ষেপ সম্পর্কে ডিমলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরি জানান, বিভিন্ন জায়গায় ভাঙন দেখা দিলে জরুরিভিত্তিতে কাজ করা হয়। বর্তমানে কেল্লাপাড়া এলাকায় ভাঙন ঠেকাতে প্রায় ২৮ লাখ টাকা ব্যয়ে জিওব্যাগ ফেলা হচ্ছে।
অন্যদিকে, দুর্গত মানুষের সহায়তার বিষয়ে ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরানুজ্জামান জানান, তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেয়ে মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়লে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত শুকনা খাবারসহ প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী সরবরাহ করা হয়ে থাকে।


আপনার মতামত লিখুন :