বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর (বিসিএম) প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবটি নতুন কিছু নয় উল্লেখ করে একে ইতিবাচকভাবে এগিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। তবে এই করিডোর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিজস্ব লাভ-ক্ষতি, আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ঝুঁকিগুলো গভীরভাবে খতিয়ে দেখার তাগিদ দিয়েছেন তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্প্রতি সই হওয়া সমঝোতা স্মারকগুলোর (এমওইউ) মাধ্যমে মূলত ঢাকার ভবিষ্যত কর্মপরিকল্পনা ও সদিচ্ছা পরখ করতে চাইছে বেইজিং।
উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া যান এবং সেখান থেকে অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী দেশ চীনে রাষ্ট্রীয় সফরে যান। এই সফরে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ১৩টি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের একটি চুক্তি সম্পন্ন হয়েছিল, যা নিয়ে এখনও নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। বেইজিং এখন পর্যবেক্ষণ করছে যে, ওয়াশিংটনের সাথে ওই বাণিজ্যিক চুক্তির পর বাংলাদেশের সাথে চীনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক কোন দিকে মোড় নেয়।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ড. ইমতিয়াজ আহমেদ এই প্রসঙ্গে বলেন, “যে এমওইউগুলো সই হয়েছে, সেগুলোর মাধ্যমে চীন দেখতে চাচ্ছে বাংলাদেশ কীভাবে নিজের হোমওয়ার্কটা করে। এখন মূল দায়িত্বটা বাংলাদেশের ওপর। বিশেষ করে ‘টু প্লাস টু’ (২+২) বৈঠকের মাধ্যমে চীন একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে নিরাপত্তা বা অন্য কোনো ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে যদি কোনো বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়, তবে বেইজিংও একই রকম সুবিধা দাবি করবে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের দু’টি পা যদি দেশের ভেতরের স্বার্থে অবিচল থাকে, তবে কোনো সংকট হবে না। কিন্তু আমাদের এক পা যদি দেশের বাইরে, বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বের দিকে ঝুঁকে থাকে, তবে এই সমঝোতা স্মারকগুলো বাস্তবায়ন করা বেশ জটিল হয়ে পড়বে।”
বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত দুই দেশের শীর্ষ বৈঠকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোরের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো সড়ক, রেল ও সমুদ্রপথে এই তিন দেশকে সংযুক্ত করে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা এবং পণ্য পরিবহনের সময় ও খরচ কমিয়ে আনা।
সাবেক কূটনীতিক মুন্সি ফয়েজ আহমেদ এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, “এটি কোনো নতুন প্রস্তাব নয়, অনেক আগে থেকেই এই আলোচনা চলছে। কেউ কেউ বলছেন বিসিআইএম (বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার) অর্থনৈতিক করিডোরকে পুনরুজ্জীবিত করার কথা হচ্ছে, আবার কেউ বলছেন শুধু তিন দেশের করিডোরের (বিসিএম) কথা। যেটাই হোক, এই উদ্যোগের দিকে আমাদের এগিয়ে যাওয়া উচিত। তবে মনে রাখতে হবে, সাধারণ ট্রানজিট বা মানবিক করিডোরের সাথে এই অর্থনৈতিক করিডোরের মেলানো যাবে না।”
এই করিডোরটিকে চীনের বৈশ্বিক মেগা প্রকল্প ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর একটি অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, করিডোরটি বাস্তবে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে মিয়ানমারের বর্তমান অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সব মিলিয়ে, বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার ভারসাম্য বজায় রেখে বাংলাদেশ কীভাবে এই অর্থনৈতিক সুযোগ কাজে লাগায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।


আপনার মতামত লিখুন :