ঢাকা মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ, ২০২৬, ১৯ ফাল্গুন ১৪৩২
Daily Global News
মস্তিষ্কের ক্ষতি কমছে ৬০%

স্ট্রোক চিকিৎসায় আশার আলো

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৮, ২০২৬, ০৮:৫০ পিএম

স্ট্রোক চিকিৎসায় আশার আলো

স্ট্রোক চিকিৎসায় বড় ধরনের আশার আলো দেখাচ্ছে যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষকের নতুন আবিষ্কার। প্রাথমিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, তাদের উদ্ভাবিত একটি নতুন ওষুধ স্ট্রোকের পর রক্ত চলাচল স্বাভাবিক হলে মস্তিষ্কের যে মারাত্মক ক্ষতি হয়, তা প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে সক্ষম।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবনের কোনো না কোনো সময়ে প্রতি চারজন মানুষের মধ্যে একজন স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। সাধারণত মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বেঁধে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে স্ট্রোক ঘটে। এই জমাট দ্রুত সরানো না গেলে মস্তিষ্কের কোষ ধীরে ধীরে মারা যেতে শুরু করে।

বর্তমানে স্ট্রোক চিকিৎসায় যেসব আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, তার মধ্যেও সফলতার হার আশানুরূপ নয়। এমনকি অত্যাধুনিক ‘মেকানিক্যাল থ্রম্বেকটমি’ পদ্ধতি প্রয়োগের পরও দশজন রোগীর মধ্যে মাত্র একজন সম্পূর্ণ স্নায়বিক সমস্যা ছাড়াই হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরতে পারেন।

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক থমাস ক্রিগ বলেন, স্ট্রোক শুধু প্রাণঘাতীই নয়, যারা বেঁচে যান তাদের অনেকের জীবন স্থায়ীভাবে বদলে যায়। চলাফেরা, কথা বলা কিংবা বোঝার ক্ষমতা হারানোর মতো জটিল সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। অথচ স্ট্রোক শুরু হয়ে গেলে চিকিৎসকদের হাতে কার্যকর বিকল্প খুবই সীমিত।

গবেষণায় দেখা গেছে, রক্ত জমাট সরিয়ে হঠাৎ করে মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ ফিরিয়ে আনলেও নতুন সমস্যা তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘ইস্কিমিয়া-রিপারফিউশন ইনজুরি’। অক্সিজেনবিহীন অবস্থার পর হঠাৎ অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্ত প্রবেশ করলে ক্ষতিগ্রস্ত কোষ থেকে ক্ষতিকর ফ্রি র‍্যাডিক্যাল তৈরি হয়, যা মস্তিষ্কে আরও প্রদাহ ও ক্ষতি বাড়িয়ে দেয়।

গবেষকরা আগেই লক্ষ্য করেছিলেন, অক্সিজেনের অভাবে মস্তিষ্কে ‘সাক্সিনেট’ নামের একটি রাসায়নিক জমে যায়। রক্তপ্রবাহ ফিরে আসার পর এই উপাদান দ্রুত বিক্রিয়া করে বিপজ্জনক ফ্রি র‍্যাডিক্যাল তৈরি করে। তবে এই প্রক্রিয়াটি ‘ম্যালোনেট’ নামের একটি অণুর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

মাইটোকন্ড্রিয়াল বায়োলজি ইউনিটের অধ্যাপক মাইক মারফি জানান, গবেষণাগারে তারা এমন একটি কৌশল বের করেছেন যাতে ম্যালোনেট খুব দ্রুত মস্তিষ্কের কোষে প্রবেশ করতে পারে। সামান্য অম্লীয় পরিবেশ তৈরি করলে এটি সহজেই ব্লাড-ব্রেইন ব্যারিয়ার অতিক্রম করে। স্ট্রোকের সময় রক্তপ্রবাহ ফিরিয়ে আনার ঠিক আগে এটি প্রয়োগ করা হলে অতিরিক্ত ক্ষতি অনেকটাই ঠেকানো যায়।

গবেষণায় ‘অ্যাসিডিফায়েড ডিসোডিয়াম ম্যালোনেট’ বা সংক্ষেপে aDSM ব্যবহার করা হয়। ইঁদুরের ওপর চালানো পরীক্ষায় মেকানিক্যাল থ্রম্বেকটমির সঙ্গে এই ওষুধ প্রয়োগ করে দেখা গেছে, মস্তিষ্কের মৃত টিস্যুর পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

গবেষক ড. জর্ডান লি বলেন, স্ট্রোকের পর মস্তিষ্কে কতটা টিস্যু নষ্ট হয়েছে, সেটিই রোগীর ভবিষ্যৎ জীবন নির্ধারণ করে। কেউ স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারবেন কিনা, কথা বলতে বা বুঝতে পারবেন কিনা—সবকিছুই এর সঙ্গে জড়িত। এই ওষুধ সেই ক্ষতির পরিমাণ কমাতে পারছে, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে যুক্তরাজ্যের এনএইচএস-এ মেকানিক্যাল থ্রম্বেকটমির ব্যবহার বাড়ছে। গবেষকদের আশা, এই নতুন ওষুধটি যুক্ত হলে স্ট্রোক রোগীদের সুস্থ হয়ে ওঠার হার অনেক বেড়ে যাবে।

এই আবিষ্কারকে বাস্তব চিকিৎসায় রূপ দিতে গবেষক দল ‘ক্যামক্সিস থেরাপিউটিকস’ নামে একটি নতুন প্রতিষ্ঠান গঠন করেছে। তারা প্রাথমিক বিনিয়োগ সংগ্রহ করে মানবদেহে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এই ওষুধ শুধু স্ট্রোক নয়, হার্ট অ্যাটাক, অঙ্গ প্রতিস্থাপন, পুনরুজ্জীবন চিকিৎসাসহ যেসব ক্ষেত্রে হঠাৎ রক্তপ্রবাহ ফিরিয়ে আনার ফলে ক্ষতি হয়, সেখানেও কার্যকর হতে পারে।

ডেইলি গ্লোবাল নিউজ

banner
Link copied!