যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান দীর্ঘদিনের সামরিক সংঘাত নিরসনে একটি অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) খসড়া কাঠামো হাতে পাওয়ার দাবি করেছে ইরান। এই প্রস্তাবিত চুক্তির আওতায় ওমানের সহযোগিতায় হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল আবারও যুদ্ধ-পূর্ববর্তী স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার বিষয়ে একটি রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে।
আজ বুধবার (২৭ মে) ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের বরাত দিয়ে এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন-তেহরান সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার পর, এই খসড়া চুক্তিকে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরানোর প্রথম বড় কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, এই অনানুষ্ঠানিক সমঝোতার আওতায় আগামী এক মাসের মধ্যে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে সব ধরনের স্বাভাবিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরুদ্ধার করবে তেহরান। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আশপাশের জলসীমা থেকে তাদের অতিরিক্ত সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে আনবে এবং তেহরানের ওপর আরোপিত সাম্প্রতিক নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করে নেবে।
তবে এই সমঝোতার খসড়া কাঠামোতে কোনো ধরনের ‘সামরিক জাহাজ’ বা যুদ্ধজাহাজ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ওমানের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যবস্থাপনার মূল দায়িত্ব এককভাবে ইরানই পালন করবে বলে খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে।
নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের খসড়া হাতে পেলেও ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, কেবল কাগজের খসড়া দেখেই তারা কোনো পদক্ষেপ নেবে না। চূড়ান্ত সমঝোতা স্বাক্ষর এবং মাঠপর্যায়ে বাস্তব যাচাই ছাড়া তেহরান এখনই হরমুজ প্রণালির ওপর থেকে নিজেদের কড়াকড়ি শিথিল করবে না।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে এই খসড়া চূড়ান্ত চুক্তিতে রূপ নিলে, সেটিকে পরবর্তীতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের (UNSC) একটি ‘বাধ্যতামূলক প্রস্তাব’ হিসেবে অনুমোদন করার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে, যাতে কোনো পক্ষই ভবিষ্যতে চুক্তি লঙ্ঘন করতে না পারে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ইতিহাসের সবচেয়ে তীব্র উত্তেজনা শুরু হলে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি খাদের কিনারে গিয়ে পৌঁছায়। দুই দেশের পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার জেরে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাটিগুলোও সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। এর ফলে হরমুজ প্রণালিসহ উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুরোপুরি ব্যাহত হয় এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে।
বিশ্ব অর্থনীতির এই চরম সংকটময় পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পরোক্ষ (ব্যাক-চ্যানেল) আলোচনা শুরু হয়। অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গোপন এই পরোক্ষ আলোচনা ও সমঝোতা প্রক্রিয়ায় বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র পাকিস্তান প্রধান মধ্যস্থতাকারীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বলে জানা গেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পাকিস্তানের এই সফল মধ্যস্থতা চূড়ান্ত রূপ পেলে তা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও বিশ্বরাজনীতিতে বড় ধরনের স্বস্তি এনে দেবে।


আপনার মতামত লিখুন :