মঙ্গলবার সকালে বনানীর টিঅ্যান্ডটি মাঠে যখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কড়াইল বস্তির নারীপ্রধান পরিবারগুলোর হাতে `ফ্যামিলি কার্ড` তুলে দিচ্ছিলেন, তখন দৃশ্যত এটি একটি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির উদ্বোধন মনে হলেও এর গভীরে রয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও প্রশাসনিক সংস্কারের এক বিশাল বার্তা। সরকার গঠনের মাত্র তিন সপ্তাহের মাথায় এই কর্মসূচির বাস্তবায়ন একদিকে যেমন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষার প্রতিফলন, অন্যদিকে এটি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছ প্রশাসনিক ব্যবস্থার একটি শক্তিশালী মহড়া।

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় দুর্নীতিমুক্ত বণ্টন: বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোতে দীর্ঘদিনের একটি বড় ক্ষত ছিল `মধ্যস্বত্বভোগী` এবং `ভুতুড়ে সুবিধাভোগী` বা দলীয়করণ। কিন্তু এই `স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড` সেই পুরনো ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। এনএফসি এবং কিউআর কোডযুক্ত এই কার্ড সরাসরি উপকারভোগীর এনআইডি এবং মোবাইল ব্যাংক হিসাবের (বিকাশ/নগদ) সাথে যুক্ত। অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ঘোষণা অনুযায়ী কোনো ম্যানুয়াল হস্তক্ষেপ ছাড়াই সফটওয়্যারের মাধ্যমে সুবিধাভোগী নির্বাচন করা হয়েছে। ফলে, টাকাটা সরাসরি সুবিধাভোগীর মোবাইলে পৌঁছাচ্ছে, মাঝপথে কারো হাত দেওয়ার বা `পার্সেন্টেজ` নেওয়ার কোনো সুযোগ থাকছে না। এটি ডিজিটাল বাংলাদেশের পরবর্তী ধাপ বা `স্মার্ট গভর্নেন্স`-এর এক অনন্য উদাহরণ।

নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক ভারসাম্য: ফ্যামিলি কার্ডের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো- এর স্বত্বাধিকারী পরিবারের `মা` বা নারী প্রধান। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, যখন সরাসরি পরিবারের নারীর হাতে নগদ অর্থ পৌঁছায়, তখন সেই অর্থের সঠিক ব্যবহার (খাদ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য) নিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। মাসে আড়াই হাজার টাকা খুব বড় অংকের মনে না হলেও, কড়াইল বা সাততলা বস্তির একজন শ্রমজীবী নারীর জন্য এটি জীবন ও মরণের ফারাক গড়ে দিতে পারে। এটি পরোক্ষভাবে নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়াবে এবং পারিবারিক সহিংসতা হ্রাসেও ভূমিকা রাখবে।

বৈশ্বিক সংকট ও সরকারের সাহসিকতা: বর্তমানে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে যখন জ্বালানি তেল ও নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী, তখন দেশের ভেতরে এমন একটি বড় বাজেটের কর্মসূচি হাতে নেওয়া নিঃসন্দেহে একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি। একদিকে তেলের রেশনিং চলছে, অন্যদিকে প্রান্তিক মানুষের হাতে নগদ টাকা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এটি মূলত সরকারের একটি ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট বা ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা। অর্থাৎ, বড় অবকাঠামোগত উন্নয়নের চেয়ে সাধারণ মানুষের `ক্রয়ক্ষমতা` ধরে রাখাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে বর্তমান সরকার।

পাইলটিং থেকে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, কিছু চ্যালেঞ্জ: ১৩টি জেলায় শুরু হওয়া এই পাইলট প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করছে মাঠ পর্যায়ের স্বচ্ছতার ওপর। যদিও সফটওয়্যারের কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু মাঠ পর্যায়ে ডাটা সংগ্রহের সময় কোনো পক্ষপাতিত্ব হয়েছিল কি না, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এছাড়া, `ডাবল ডিপিং` রোধ করার জন্য সকল সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে দ্রুত একটি মাত্র ডিজিটাল আমব্রেলা বা ছাতার নিচে নিয়ে আসা জরুরি।

আগামী ৩০ জুনের মধ্যে সরকার যদি সফলভাবে এই পাইলটিং শেষ করে সারাদেশে বিস্তৃত করতে পারে, তবে এটি হবে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম আধুনিক ও স্বচ্ছ সামাজিক নিরাপত্তা মডেল। ফ্যামিলি কার্ড কেবল কার্ড নয়; এটি প্রান্তিক মানুষের রাষ্ট্রীয় অধিকারের এক ডিজিটাল স্বীকৃতি। কড়াইল বস্তির সেই নারীদের চোখে আজ যে আনন্দ অশ্রু দেখা গেছে, তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ওমর ফারুক, গণমাধ্যমকর্মী


আপনার মতামত লিখুন :