উমরাহ কী?
উমরাহ হলো একটি ইসলামি ইবাদতভিত্তিক পবিত্র সফর, যা সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে সম্পন্ন করা হয়।
হজের মতো উমরাহ ফরজ নয়। হজ মুসলমানদের জন্য জীবনে অন্তত একবার ফরজ ইবাদত হলেও, উমরাহ একটি নফল ইবাদত, যা বছরের যেকোনো সময় আদায় করা যায়।
হজের মতো উমরাহ পালনের ক্ষেত্রেও কিছু নির্দিষ্ট ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা বা বিধান রয়েছে, যা যথাযথভাবে পালন করলেই উমরাহ গ্রহণযোগ্য হয়।
উমরাহর আনুষ্ঠানিকতা ও সময়কাল
উমরাহর পবিত্র আনুষ্ঠানিকতা সাধারণত কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সম্পন্ন করা যায়। পুরো প্রক্রিয়াটি মূলত তিনটি ধাপে বিভক্ত—ইহরাম, তাওয়াফ ও সাঈ।
ইহরাম হলো আত্মশুদ্ধির ধাপ। এ সময় মুসল্লিরা নির্দিষ্ট পোশাক পরিধান করে নিয়ত করেন এবং একটি পবিত্র অবস্থায় প্রবেশ করেন।
এরপর রয়েছে তাওয়াফ। এতে কাবা শরিফের চারপাশে সাতবার ঘোরার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে দোয়া ও ইবাদত করা হয়। প্রতিটি চক্করে বিভিন্ন দোয়া ও জিকির পাঠ করা হয়।
সবশেষে সাঈ। এতে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে সাতবার যাতায়াত করতে হয়। সাঈ শেষ হলে পুরুষদের জন্য মাথা সম্পূর্ণ মুণ্ডন করা (হালক) অথবা চুল ছোট করা (তাকসির) এবং নারীদের জন্য সামান্য চুল কাটার মাধ্যমে উমরাহ সম্পন্ন হয়।
রমজানে উমরাহ
মুসলমানদের কাছে উমরাহ পালনের সবচেয়ে জনপ্রিয় সময়গুলোর একটি হলো পবিত্র রমজান মাস। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর শুধু রমজানের প্রথম ১০ দিনেই প্রায় ৯০ লাখের বেশি মুসল্লি উমরাহ আদায় করেছেন।
এই বিপুল চাহিদার কারণে রমজান মাসে উমরাহ প্যাকেজ তুলনামূলক ব্যয়বহুল হয়ে থাকে। একই সঙ্গে প্রচণ্ড ভিড়ের কারণে ইবাদত সম্পন্ন করতেও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় লাগতে পারে।
এ কারণে রমজানে উমরাহ করতে গেলে দিনের বেশিরভাগ সময় ইবাদতের জন্য খালি রাখা উত্তম।
কেন রমজানে উমরাহ করার পরামর্শ দেওয়া হয়?
অনেক মুসলমান বিশ্বাস করেন, রমজানে উমরাহ পালনের ফজিলত অত্যন্ত বেশি এবং এর সওয়াব হজের সমান।
এই বিশ্বাসের ভিত্তি হলো মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর একটি হাদিস, যা তাঁর চাচাতো ভাই ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেন—
“রমজান মাসে উমরাহ আদায় করো, কেননা রমজানে উমরাহ করার সওয়াব হজের সমান।”
তবে এর অর্থ এই নয় যে, রমজানে উমরাহ করলে ফরজ হজের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়া যায়। বরং এটি অতিরিক্ত সওয়াব অর্জনের একটি বিশেষ সুযোগ।
রমজানে উমরাহর দোয়া
দোয়া হলো আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সবচেয়ে শক্তিশালী সংযোগ মাধ্যম। রমজানে উমরাহকালীন দোয়াগুলোর মর্যাদা আরও বেশি। উমরাহ সফরের আগে নির্ধারিত দোয়াগুলো মুখস্থ বা জানা থাকলে তা ইবাদতে একাগ্রতা বাড়ায়। এর মধ্যে রয়েছে সফরের দোয়া, প্রথমবার কাবা শরিফ দেখার দোয়া, মসজিদুল হারামে প্রবেশের দোয়া এবং উমরাহর প্রতিটি ধাপে পাঠযোগ্য বিশেষ দোয়া।
রমজানে উমরাহর প্রস্তুতি
আগেভাগে পরিকল্পনা
আগেভাগে সৌদি আরব সফরের পরিকল্পনা করলে ভ্রমণজনিত দুশ্চিন্তা অনেকটাই কমে যায়। এতে মনোযোগ পুরোপুরি ইবাদত ও আত্মিক উন্নয়নের দিকে দেওয়া সম্ভব হয়। এ ছাড়া আরামদায়ক ও উপযুক্ত আবাসন বেছে নেওয়াও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে আমরা কথা বলেছি ‘উমরাহমি (উমরাহমি - UmrahMe)’ নামক একটি প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে, যা উমরাহ যাত্রীদের জন্য আবাসনসহ সার্বিক সেবার একটি সমন্বিত সমাধান প্রদান করে। মোহাম্মদ বিন মাহফুজ ‘উমরাহমি’ উদ্যোগের মূল উদ্যোক্তা, যার লক্ষ্য উমরাহ যাত্রায় মুসল্লিদের সম্মুখীন বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ দূর করা। তিনি জানান, এই প্ল্যাটফর্ম স্বচ্ছতা, ২৪ ঘণ্টার ডিজিটাল সহায়তা এবং মুসল্লিদের মধ্যে একটি কমিউনিটি গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়। উমরাহ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে সহজ করে মুসল্লিদের একটি নির্বিঘ্ন ও আত্মিকভাবে সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা দেওয়াই তাদের লক্ষ্য। তিনি বলেন, “আমাদের মূল লক্ষ্য হলো বিশ্বাস তৈরি করা, মানুষের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা এবং সময়ের চাহিদা অনুযায়ী নতুনত্ব নিয়ে আসা।”
শারীরিক প্রস্তুতি
উমরাহ শুধু আত্মিক ও মানসিক প্রস্তুতির বিষয় নয়, শারীরিক সক্ষমতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় হাঁটতে হয় বলে আগে থেকেই শরীরচর্চা করা ভালো। এতে রোজা রেখেও শক্তি ধরে রাখা সহজ হয়।
পোশাক
ভ্রমণের আগে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে নেওয়া জরুরি, বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে প্রচণ্ড গরম থাকে। ভালো মানের হাঁটার স্যান্ডেল এবং ইহরামের জন্য উপযুক্ত পোশাক সঙ্গে রাখা উচিত।
ভিড় সামলানো
রমজানে উমরাহ করতে আসা মুসল্লির সংখ্যা অনেক বেশি থাকে। তাই পরিবার বা সঙ্গীদের কাছাকাছি থাকা জরুরি। কেউ হারিয়ে গেলে কোথায় মিলিত হবেন—সে বিষয়ে আগেই একটি নির্দিষ্ট স্থান ঠিক করে রাখা ভালো।
উপসংহার
সব মিলিয়ে বলা যায়, রমজানে উমরাহ অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি ইবাদত। জীবনে অন্তত একবার এই পবিত্র সফর করা নিঃসন্দেহে সৌভাগ্যের বিষয়। তবে এই আত্মিক পরিবেশ ও অভিজ্ঞতা একবার অনুভব করলে, অনেকেরই বারবার ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা জাগে।


আপনার মতামত লিখুন :