মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ছে। চলমান যুদ্ধবিরতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে পরিস্থিতিকে “মারাত্মক সংকটাপন্ন” বলে আখ্যা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্যদিকে, ইরানও স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, যেকোনো আগ্রাসনের “কঠোর জবাব” দিতে প্রস্তুত রয়েছে তাদের সশস্ত্র বাহিনী।
সোমবার ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতি বর্তমানে “ম্যাসিভ লাইফ সাপোর্টে” রয়েছে। তিনি এমনকি পরিস্থিতিকে এমন এক রোগীর সঙ্গে তুলনা করেন, যার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা মাত্র “এক শতাংশ”।
ট্রাম্প অভিযোগ করেন, ইরানি নেতারা বারবার নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি প্রস্তাবের জবাবে তেহরান যে পাল্টা প্রস্তাব পাঠিয়েছে, সেটি “সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য” ও “আবর্জনা”।
বিশেষ করে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণে অস্বীকৃতির বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তার ভাষায়, “ইরানের কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না।”
ট্রাম্পের বক্তব্যের পরপরই প্রতিক্রিয়া জানায় তেহরান। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী যেকোনো ধরনের হামলার জবাব দিতে প্রস্তুত।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানি জনগণের “১৪-দফা অধিকারভিত্তিক প্রস্তাব” মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। একই সঙ্গে সতর্ক করে দেন ওয়াশিংটন যত দেরি করবে, মার্কিন করদাতাদের খরচ তত বাড়বে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই দাবি করেন, তেহরানের প্রস্তাব ছিল “দায়িত্বশীল” এবং “উদার”।
ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিমের তথ্য অনুযায়ী, তেহরানের ১৪-দফা প্রস্তাবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে:
লেবাননসহ সব অঞ্চলে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ
ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার
হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া
ভবিষ্যতে নতুন হামলা না চালানোর নিশ্চয়তা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ
হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা
বিশ্লেষকদের মতে, এসব শর্ত মূলত সামরিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কৌশল হিসেবেই তুলে ধরছে তেহরান।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারে হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালী কার্যত অবরুদ্ধ করে রাখে। এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায় এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের নৌবন্দরগুলোর ওপর অবরোধ অব্যাহত রাখে, যা তেহরানের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে তোলে।
এদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্ট জানিয়েছেন, যুদ্ধ শেষ করতে হলে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরানে এখনও কিছু ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র সক্রিয় রয়েছে এবং সেগুলো ধ্বংস করা প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক সমাধানের পথকে আরও জটিল করে তুলছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রও একটি ১৪-দফা সম্বলিত প্রাথমিক স্মারকলিপি প্রস্তুত করেছে। সেখানে ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি স্থগিত, হরমুজ প্রণালী দিয়ে অবাধ জাহাজ চলাচল, বিনিময়ে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এর মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তবে দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে এখনও বড় ধরনের দূরত্ব রয়ে গেছে। প্রায় ৪০ দিনের সংঘাতের পর গত এপ্রিল মাসে সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। পরে পাকিস্তান-এর মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনা শুরু হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সমাধান আসেনি।
বর্তমানে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সামান্য উসকানিও নতুন করে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের জন্ম দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা নতুন করে সংঘাতে রূপ নিলে এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিশ্ব জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, এমনকি বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাও বড় ধাক্কার মুখে পড়তে পারে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী ঘিরে নতুন সংকট তৈরি হলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে, যার প্রভাব পড়বে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতেও। সূত্র: বিবিসি


আপনার মতামত লিখুন :