যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি বহুল প্রতীক্ষিত শান্তি চুক্তি নিয়ে কূটনৈতিক তোড়জোড়ের মাঝেই আকস্মিকভাবে নতুন করে যুদ্ধাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় গুরুত্বপূর্ণ নৌঘাঁটি ও বন্দর নগরী ‘বন্দর আব্বাস’-এর কাছে নতুন করে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। ওয়াশিংটনের দাবি, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং হরমুজ প্রণালিতে মাইন বসানোর কাজে নিয়োজিত থাকা ইরানি নৌযানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে এই হামলা চালানো হয়েছে।
আজ (২৬ মে) যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড এক বিবৃতিতে হামলার সত্যতা নিশ্চিত করেছে। তারা এই পদক্ষেপকে ‘আত্মরক্ষামূলক’ বলে অভিহিত করেছে। সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স বলেছেন, “চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যে সর্বোচ্চ সংযম বজায় রেখেই ইরানি বাহিনীর পক্ষ থেকে আসা সরাসরি হুমকি থেকে আমাদের সেনাদের রক্ষা করতে এই হামলা চালানো হয়েছে।”
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই হামলার আগে বন্দর আব্বাসে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে যে স্থানীয় কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করেছেন। তবে তেহরানের পক্ষ থেকে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।
গত সপ্তাহের শেষ দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে উভয় পক্ষ একটি চূড়ান্ত চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে। তবে গতকাল সোমবার রাতে ট্রাম্প তার সুর কিছুটা নরম করে এই আলোচনার সাথে জড়িত মার্কিন প্রতিনিধিদের “তাড়াহুড়ো না করার” নির্দেশ দিয়েছেন।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দাবি করেছিলেন যে রোববারের মধ্যেই একটি চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে। তবে এর জবাবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমায়েল বাঘাই তেহরানে স্পষ্ট করে বলেছেন, “এটি বলা ঠিক হবে যে আমরা আলোচনার অধীনে থাকা বড় অংশের বিষয়ে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি। তবে এর মানেই যে একটি চুক্তি স্বাক্ষর এখনই হয়ে যাবে—এমন দাবি কেউ করতে পারে না। সংঘাত অবসানের কোনো চুক্তি শিগগিরই হওয়ার সম্ভাবনা কম।”
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, বর্তমানে মূলত একটি ‘সমঝোতা স্মারক’ নিয়ে আলোচনা চলছে, যার মূল শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে— ৬০ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো, বিশ্ব অর্থনীতির লাইফলাইন ‘হরমুজ প্রণালি’ পুনরায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য খুলে দেওয়া এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে পরবর্তীতে স্থায়ী আলোচনার রূপরেখা তৈরি করা।
এদিকে মার্কিন গণমাধ্যম সিবিএস নিউজ গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে। মার্কিন গোয়েন্দাদের দাবি, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বর্তমানে একটি সম্পূর্ণ গোপন ও নিচ্ছিদ্র স্থানে অবস্থান করছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনে ইসরায়েলি ও মার্কিন যৌথ বিমান হামলায় তার বাবা ও পূর্বসূরি আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার সময় মোজতবা নিজেও গুরুতর আহত হয়েছিলেন। বর্তমানে তার গোপন অবস্থানের কারণে তেহরানের মূল পরমাণু ও কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের সাথে যোগাযোগ করা কঠিন হয়ে পড়েছে এবং এর ফলেই ওয়াশিংটনের সাথে আলোচনার গতি নাটকীয়ভাবে ধীর হয়ে গেছে।
মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, যুদ্ধের শুরুতে ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি (৯৭০ পাউন্ড) ইউরেনিয়াম ছিল, যা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা হয়েছে। এটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপযোগী (৯০ শতাংশ বিশুদ্ধতা) মাত্রার অত্যন্ত কাছাকাছি।
এই বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন, চুক্তি করতে হলে এই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হয় “তাৎক্ষণিকভাবে” মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে হবে, অথবা আন্তর্জাতিক তদারকিতে ইরানি প্রজাতন্ত্রের ভেতরেই তা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে ফেলতে হবে। তবে নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও ইরানের জব্দ করা তহবিল ছেড়ে দেওয়ার মতো জটিল বিষয়গুলো নিয়ে এখনই কোনো চূড়ান্ত মীমাংসা সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন রয়টার্সের বিশ্লেষকরা।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে একযোগে বড় ধরনের বিমান হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূচনা হয়। এর জবাবে ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর ওপর মুহুর্মুহু ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান এবং কার্যকরভাবে হরমুজ প্রণালির নৌ-চলাচল বন্ধ করে দেয়। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গত ৮ই এপ্রিল থেকে উভয় পক্ষ একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি পালন করে আসছিল, যা আজকের মার্কিন হামলার পর সম্পূর্ণ ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। সূত্র: বিবিসি


আপনার মতামত লিখুন :