এতদিন মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যকার দ্বৈরথ মূলত ‘ছায়াযুদ্ধ’ হিসেবেই পরিচিত ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক এক চাঞ্চল্যকর তথ্যে জানা গেছে, প্রথমবারের মতো ইরানের ভূখণ্ডে সরাসরি সামরিক অভিযান চালিয়েছে সৌদি আরব। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ চলাকালীন তেহরানের হামলার জবাবে রিয়াদ এই ‘গোপন’ পাল্টা আঘাত হানে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে মঙ্গলবার এই বিস্ফোরক তথ্য সামনে আনা হয়েছে। দুজন পশ্চিমা কর্মকর্তা এবং ইরানের দুই কর্মকর্তার বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, সৌদি আরবের এই পদক্ষেপ আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে তাদের ‘আক্রমণাত্মক’ আত্মরক্ষার নতুন এক নজির স্থাপন করেছে।
যেভাবে শুরু পাল্টা আঘাত: প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে। জবাবে ইরান গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলভুক্ত (জিসিসি) দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এই সময় সৌদি আরবের বিভিন্ন বেসামরিক স্থাপনা, বিমানবন্দর ও তেল শোধনাগার লক্ষ্য করে হামলা চালায় তেহরান।
মার্কিন প্রতিরক্ষা বলয় থাকা সত্ত্বেও সৌদি ভূখণ্ডে ইরানের আঘাত রিয়াদকে ভাবিয়ে তোলে। এর প্রেক্ষিতেই গত মার্চের শেষ দিকে সৌদি বিমানবাহিনী সরাসরি ইরানের ভেতরে অভিযান পরিচালনা করে। একজন পশ্চিমা কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, “সৌদি আরব আক্রান্ত হওয়ার পরই ‘ইট মারলে পাটকেল খেতে হয়’ নীতিতে পাল্টা জবাব দিতে হামলার পথ বেছে নেয়।”
গোপন হামলা ও কূটনৈতিক কৌশল: সৌদি আরব এই হামলার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে কখনও স্বীকার করেনি। এমনকি ইরানের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করা হয়নি। তবে ইরানের কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, রিয়াদ তাদের হামলার কথা তেহরানকে জানিয়েছিল এবং ভবিষ্যতে আরও বড় পাল্টা জবাবের হুমকি দিয়েছিল।
আকর্ষণীয় বিষয় হলো, হামলার পর দুই দেশ উত্তেজনা প্রশমনে নিবিড় কূটনৈতিক যোগাযোগ স্থাপন করে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রজেক্ট ডিরেক্টর আলী ভায়েজ বলেন, “উভয় পক্ষই উপলব্ধি করেছে যে, নিয়ন্ত্রণহীন সংঘাত কারো জন্যই ভালো ফল আনবে না। মূলত এই হামলার মাধ্যমেই রিয়াদ তেহরানকে তার সক্ষমতার জানান দিয়েছে।”
উত্তেজনা প্রশমন ও সমঝোতা: রয়টার্সের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২৫ থেকে ৩১ মার্চের মধ্যে সৌদি আরবে ১০৫টির বেশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছিল। কিন্তু সৌদি আরবের পাল্টা হামলার হুমকির পর ১ থেকে ৬ এপ্রিলের মধ্যে সেই সংখ্যা ২৫-এ নেমে আসে।
গত ৭ এপ্রিল ওয়াশিংটন ও তেহরান যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে সৌদি ও ইরানের মধ্যে একটি অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা কার্যকর হয়। এর লক্ষ্য ছিল পারস্পরিক বৈরিতা কমিয়ে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ: মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষকদের মতে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের পর সৌদি আরবের এই গোপন হামলা প্রমাণ করে যে, উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো এখন আর কেবল মার্কিন সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল নয়। নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তারা এখন সরাসরি প্রতিবেশী দেশের ভেতরে আঘাত হানতেও দ্বিধা করছে না।
যদিও বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত, তবে রিয়াদের এই ‘সাহসী’ অবস্থান ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


আপনার মতামত লিখুন :