ঢাকা শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬, ২৮ ফাল্গুন ১৪৩২
Daily Global News

ঈদযাত্রায় দ্বিমুখী সংকট: জ্বালানি রেশনিং আর ‘টিকিট ফাঁদে’ দিশেহারা সাধারণ মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: মার্চ ১০, ২০২৬, ০৯:৪০ পিএম

ঈদযাত্রায় দ্বিমুখী সংকট: জ্বালানি রেশনিং আর ‘টিকিট ফাঁদে’ দিশেহারা সাধারণ মানুষ

ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা বাংলাদেশের মানুষের চিরাচরিত রীতি। কিন্তু এবারের ঈদযাত্রা যেন এক অনিশ্চিত অগ্নিপরীক্ষার নাম। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে দেশজুড়ে তীব্র জ্বালানি সংকট, অন্যদিকে এই সংকটকে পুঁজি করে পরিবহন মালিকদের ‘টিকিট লুকোচুরি’ সব মিলিয়ে এক চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে পরিবহন খাতে।

বিপিসি বর্তমানে ডিজেল সরবরাহে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছে। নিয়ম অনুযায়ী, একটি দূরপাল্লার বাস সর্বোচ্চ ২০০-২২০ লিটার তেল নিতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে চিত্র ভিন্ন। পাম্পগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি। অনেক বাস মালিক বাধ্য হয়ে খোলা বাজার থেকে ১২৫ টাকা লিটার দরে ড্রামে করে তেল কিনছেন। পরিবহন মালিকদের দাবি, এভাবে লোকসান দিয়ে বাস চালানো অসম্ভব।

গত ৩ মার্চ থেকে অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হলেও তেলের সংকটের অজুহাতে অনেক কোম্পানি তা বন্ধ করে দিয়েছে।

হানিফ এন্টারপ্রাইজের জেনারেল ম্যানেজার মোশাররফ হোসেন জানান, অনলাইনে টিকিট ছাড়লেও সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি কী হবে তা বলা কঠিন।

অন্যদিকে, শ্যামলী এনআর ট্রাভেলসের এমডি শুভঙ্কর ঘোষ রাকেশ সতর্ক করে বলেছেন, "সরকার দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ঈদের সময় বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে।"

যাত্রীদের অভিযোগ, অগ্রিম টিকিট বন্ধ রাখা মূলত শেষ মুহূর্তে বাড়তি ভাড়া আদায়ের একটি চাল।

জামালপুর রুটের একযাত্রী আক্ষেপ করে বলেন, "এখন যা ৩৫০ টাকা, ঈদের ভিড়ে সেই টিকিট ৫০০-৬০০ টাকা হয়ে যাবে। টাকা দিয়েও টিকিট পাব কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।" সাধারণ মানুষের আশঙ্কা, তেল সংকট ও ঈদ এই দ্বিমুখী অজুহাতে এবার ভাড়ার নৈরাজ্য সব সীমা ছাড়িয়ে যাবে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, "জ্বালানি সংকট এক নতুন আপদ। নীতিনির্ধারকদের সঠিক তদারকি না থাকলে এই পরিস্থিতিকে পুঁজি করে ভাড়া নৈরাজ্য চরমে উঠবে এবং মানুষের ভোগান্তি কয়েক গুণ বেড়ে যাবে।"

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার বর্তমান অবস্থা নিম্নরূপ: বর্তমান মজুত ১ লাখ ২০ হাজার ২৩৭ টন (যা দিয়ে আগামী ১৩ দিন চলবে)। দৈনিক চাহিদা প্রায় ৯ হাজার ২২ টন। আগামী ১৩ মার্চের মধ্যে আরও ১ লাখ ৪৭ হাজার ২০৫ টন ডিজেল নিয়ে পাঁচটি জাহাজ দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

নতুন এই সরবরাহ যুক্ত হলে আরও ১৬ দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে। তবে আমদানিকৃত এই তেল দ্রুত পাম্পগুলোতে না পৌঁছালে ঈদের সময় সড়কে যানবাহনের চেয়ে অপেক্ষমাণ যাত্রীর সংখ্যাই বেশি হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, বিআরটিএ নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে বাড়তি টাকা নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। তেলের দাম বাড়লে বা সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এই আশ্বাস কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।

সরকারের উচিত এখনই বিশেষ ব্যবস্থায় পরিবহন খাতের জন্য জ্বালানি বরাদ্দ নিশ্চিত করা এবং জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে বাস টার্মিনালগুলোতে কঠোর মনিটরিং সেল গঠন করা। অন্যথায়, সাধারণ মানুষের ঈদ আনন্দ বিষাদে পরিণত হতে পারে।

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!