গত ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর নিজের প্রথম বিদেশ সফরে যাচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে তাঁর এই প্রথম বিদেশ সফর ঘিরেই দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক কৌতূহল ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। চিরাচরিত প্রথা ভেঙে প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রথম সফরের জন্য দক্ষিণ এশিয়ার দুই পরাশক্তি ভারত ও চীনকে এড়িয়ে তৃতীয় একটি দেশ হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী আগামী ২১ ও ২২শে জুন মালয়েশিয়া সফর করবেন। এরপর ২৩শে জুন কুয়ালালামপুর থেকেই সরাসরি বেইজিংয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন এবং ২৬শে জুন চার দিনের চীন সফর শেষে ঢাকায় ফিরবেন। প্রধানমন্ত্রীর এই মেগা সফরের খুঁটিনাটি চূড়ান্ত করতে ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এখন জোর প্রস্তুতি চলছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘকাল ধরেই প্রতিবেশী দেশ ভারত এবং অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীনকে কেন্দ্র করে এক ধরনের ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন দৃশ্যমান। বিদায়ী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের সাথে অতি-ঘনিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় উষ্মা প্রকাশ করা হয়েছিল। ২০২৪ সালে পটপরিবর্তনের পর বেইজিং দ্রুতই বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও দলগুলোর সাথে নিবিড় যোগাযোগ গড়ে তোলে।
যদিও সরকার গঠনের পর ভারত ও চীন উভয় দেশের পক্ষ থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা স্বশরীরে এসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আমন্ত্রণপত্র হস্তান্তর করেন; আবার অন্যদিকে চীনের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রদূতের পক্ষ থেকেও দফায় দফায় আমন্ত্রণ আসে।
বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথম সফরেই ভারত কিংবা চীনের যেকোনো একটিকে বেছে নিলে কূটনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকত। তাই ভারত-চীন বিতর্ক পুরোপুরি এড়াতে এবং আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের ‘নিরপেক্ষ’ অবস্থানের বার্তা দিতেই প্রধানমন্ত্রী প্রথম গন্তব্য হিসেবে কুয়ালালামপুরকে বেছে নিয়েছেন।
বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানির অন্যতম বড় বাজার মালয়েশিয়া হলেও সিন্ডিকেট ও বিভিন্ন জটিলতার কারণে বর্তমানে এই বাজারটি বাংলাদেশের জন্য বন্ধ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে দেশটির শ্রমবাজার পুনরায় চালু করা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মালয়েশিয়ায় বর্তমানে যেসব বাংলাদেশি শ্রমিক অবৈধ বা নথিপত্রহীন অবস্থায় আছেন, তাদের আইনি প্রক্রিয়ায় বৈধতা দেওয়া এবং নতুন করে জনশক্তি রপ্তানির সব বাধা দূর করার বিষয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে তারেক রহমানের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এর পাশাপাশি শিক্ষাখাতেও দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর নিয়ে স্বস্তি থাকলেও কূটনৈতিক মহলে সবচেয়ে বেশি কৌতূহল তৈরি হয়েছে তাঁর ২৩ জুনের চীন সফর নিয়ে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বেইজিং সফরে বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রতিরক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে প্রায় ১৫টির মতো সমঝোতা স্মারক (MOU) স্বাক্ষরিত হতে পারে।
এ সফরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কয়েকটি মেগা প্রকল্পের জন্য চীনের সহযোগিতা চাওয়া হবে। যার মধ্যে রয়েছে: প্রস্তাবিত দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্প। বহুল আলোচিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা। যমুনা নদীতে আরেকটি নতুন সেতু নির্মাণ।
বাংলাদেশে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা (সম্প্রতি একনেকে চীনের ঋণে ৪ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে)।
এছাড়া বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাণে বিনিয়োগ, চীনা মুদ্রায় বিশেষ বন্ড চালু, কৃষি প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং বাংলাদেশে একটি চীনা ব্যাংক স্থাপনের মতো দূরদর্শী প্রস্তাবগুলো এই সফরে টেবিলে উঠতে পারে। একই সময়ে বেইজিংয়ে একটি বড় বিনিয়োগ সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তুতিও নিচ্ছে ঢাকা।
চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, "চীন সফরের আগে প্রধানমন্ত্রী অন্য কোনো দেশে গেলেন কি না, তা নিয়ে বেইজিং সাধারণত মাথা ঘামায় না। ফলে প্রথমে মালয়েশিয়া যাওয়াতে কূটনৈতিক কোনো ক্ষতি নেই। তবে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের সাথেও সুসম্পর্কের সুনির্দিষ্ট স্বার্থ রয়েছে এবং সেই সম্পর্ককে প্রত্যাশিত মানে নিয়ে আসতে দুই পক্ষকেই উদ্যোগী হতে হবে।"
আঞ্চলিক রাজনীতির বিশ্লেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. ফরিদ হোসেন বলেন, “প্রথম সফরের জন্য মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়া প্রধানমন্ত্রীর একটি দুর্দান্ত কৌশলগত সিদ্ধান্ত। মালয়েশিয়ার সাথে চীন ও পশ্চিমা উভয় পক্ষেরই ভালো সম্পর্ক রয়েছে। তারেক রহমান মূলত চীন ও ভারতের মধ্যে একটি বাস্তবসম্মত ভারসাম্য দেখাতে চাইছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর চীন যেভাবে বাংলাদেশের সব মহলের সাথে সম্পর্ক বাড়িয়েছে, ভারত এখনো সেই তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে আছে। সব মিলিয়ে এই সফর মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার রাজনীতিতে বাংলাদেশের এক নতুন যুগের সূচনা করতে পারে।” সূত্র: বিবিসি


আপনার মতামত লিখুন :