ঢাকা শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩
Daily Global News

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত খোলার অনুরোধ, মধ্যস্বত্বভোগী রুখতে ৩ চুক্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: জুন ২২, ২০২৬, ১২:৩৬ পিএম

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত খোলার অনুরোধ, মধ্যস্বত্বভোগী রুখতে ৩ চুক্তি

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজের প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া গিয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে অত্যন্ত সফল ও ফলপ্রসূ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক সম্পন্ন করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে বাংলাদেশের আইসিটি, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু স্থগিত থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত উন্মুক্ত করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বৈঠক শেষে দুই দেশের মধ্যে ৩টি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।

আজ সোমবার (২২ জুন) মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রজায়ায় দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর একান্ত ও দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।

যৌথ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে আরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনার জোরালো অনুরোধ জানিয়েছি। পাশাপাশি মালয়েশিয়ায় থাকা অনিয়মিত বাংলাদেশি শ্রমিকদের বৈধকরণ এবং বর্তমানে বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টারে আটকে থাকা বাংলাদেশিদের মানবিক দিক বিবেচনা করে সম্ভাব্য প্রত্যাবাসনের বিষয়টিও উত্থাপন করেছি।”

শ্রমিক নিয়োগে সিন্ডিকেট ও অতিরিক্ত খরচের ভোগান্তি কমানোর ওপর জোর দিয়ে তারেক রহমান বলেন, “আমরা দুই দেশই একমত হয়েছি যে, এবার কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া হতে হবে শতভাগ স্বচ্ছ, ন্যায্য ও সাশ্রয়ী; যাতে করে অনৈতিক মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের ভূমিকা পুরোপুরি বন্ধ হয় এবং সাধারণ শ্রমিকদের অভিবাসন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়।”

বাংলাদেশি কর্মীদের অধিকার রক্ষায় তারেক রহমানের দৃঢ় অবস্থানের প্রশংসা করে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অকপটতা এবং আমাদের অভিন্ন সংকল্পের প্রতি তাঁর প্রতিশ্রুতিকে আমি সাধুবাদ জানাই। হ্যাঁ, মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য আমাদের বিদেশি কর্মী প্রয়োজন, তবে তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আমাদের এখানে আসা কর্মী এবং তাদের পরিবারের কল্যাণ।”

আনোয়ার ইব্রাহিম অত্যন্ত কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “কর্মীদের অবিরত শোষণ করা, তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করা এবং নিছক ব্যক্তিগত বা কোনো কোম্পানির লাভের জন্য তাদের দাস হিসেবে ব্যবহার করা মালয়েশিয়া কোনোভাবেই সহ্য করবে না। ব্যক্তিগতভাবে এবং দ্বিপক্ষীয় বৈঠকেও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী কর্মীদের সুরক্ষায় যে আন্তরিক মনোভাব ব্যক্ত করেছেন, আমি তার ভূয়সী প্রশংসা করি।” সফররত প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, দুই দেশের এই পারিবারিক বন্ধন ভবিষ্যতে আরও সুদৃঢ় হবে।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার সঙ্গে তাঁর পরিবারের ঐতিহাসিক ও আবেগঘন সম্পর্কের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার প্রথম বিদেশ সফর এটি। আমার বাবা, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালের এপ্রিলে মালয়েশিয়া সফর করেছিলেন, যা দুই দেশের মধ্যে শ্রমিক সহযোগিতার মূল ভিত্তি স্থাপন করেছিল। পরবর্তীতে আমার মা বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মালয়েশিয়া সফর করেছিলেন, যা আমাদের বন্ধুত্বকে আরও গভীর করেছিল। আজ আমি এসে সেই সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলাম।”

দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির সংসদীয় নির্বাচনে জনগণের সমর্থনে শক্তিশালী ম্যান্ডেট পেয়েছিল। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমরা দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ ফিরিয়ে এনেছি।” তিনি বাংলাদেশের আইসিটি, সেমিকন্ডাক্টর, হালাল শিল্প ও ডিজিটাল অর্থনীতিতে মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের আমন্ত্রণ জানান।

বৈঠকের মূল অর্জন ও সিদ্ধান্তসমূহ:

১. শ্রমবাজার দ্রুত উন্মুক্ত করা ও মধ্যস্বত্বভোগী মুক্ত সাশ্রয়ী নিয়োগে সহমত।
২. আনঅফিসিয়াল বা অনিয়মিত কর্মীদের বৈধকরণ ও বন্দিদের প্রত্যাবাসন।
৩. বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া।
৪. জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনের সভাপতিত্বে বাংলাদেশকে মালয়েশিয়ার সমর্থন।
৫. রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরিতে মালয়েশিয়ার প্রতিশ্রুতি।

আসিয়ান ও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মিয়ানমারে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে মালয়েশিয়ার অব্যাহত সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানান। এছাড়া বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট ‘আসিয়ান’-এর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততা চায় এবং আসিয়ান সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার ও রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ-এ যোগ দিতে মালয়েশিয়ার সক্রিয় সমর্থন কামনা করেছে।

যৌথ সংবাদ সম্মেলন শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান এবং বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে এক রাষ্ট্রীয় মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন। এই মধ্যাহ্নভোজ উপলক্ষে মালয়েশিয়ার শিল্পীরা মালয় ও বাংলা উভয় ভাষায় ঐতিহ্যবাহী গান গেয়ে এক চমৎকার সাংস্কৃতিক পরিবেশনা উপস্থাপন করেন।

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!