মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক সইয়ের খবর শুনে নতুন আশায় বুক বেঁধেছিলেন পারস্য উপসাগরে আটকে থাকা বাংলাদেশি জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’র নাবিকেরা। ধারণা ছিল, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ উন্মুক্ত হলে তাদের দীর্ঘ অনিশ্চয়তার অবসান ঘটবে। কিন্তু সেই প্রতীক্ষার অবসান এখনো হয়নি। সমঝোতা চুক্তি কার্যকর হওয়ার পরও হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়ায় সমুদ্রেই আটকে আছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) এই জাহাজটি।
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘মেরিন ট্রাফিক’-এর তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার দুই দেশের চুক্তি ঘোষণার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে অন্তত ২৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ যাতায়াত করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জাহাজ অনুমতি নিয়ে প্রণালি অতিক্রম করতে পারলেও, আজ শনিবার (২০ জুন) পর্যন্ত হরমুজ পার হওয়ার সবুজ সংকেত পায়নি বাংলাদেশি এই জাহাজটি।
জাহাজটির ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম পারস্য উপসাগরে নোঙর করা জাহাজ থেকে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে বলেন, “সমঝোতা হলেও হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ইরানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বর্তমানে বেছে বেছে যেসব জাহাজকে বিশেষ অনুমতি দিচ্ছে, তারাই কেবল হরমুজ পার হতে পারছে। আমাদের জাহাজের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি, আমরা এখনো অপেক্ষায় আছি।”
দীর্ঘ চার মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই প্রতীক্ষা নাবিকদের মানসিক চাপ ও ট্রমা চরম পর্যায়ে নিয়ে ঠেকেছে। জাহাজটিতে থাকা ৩১ জন নাবিকই বাংলাদেশি। গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর পর থেকে তাঁরা প্রতিনিয়ত ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কা, বিকট বিস্ফোরণের শব্দ এবং দুই দেশের যুদ্ধজাহাজের ভীতিকর সামরিক তৎপরতার মধ্যেই দিন কাটিয়েছেন।
জাহাজটির কর্মকর্তারা জানান, যুদ্ধ শুরুর পর অন্তত তিনবার হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে নিরাপদ আন্তর্জাতিক জলসীমায় ফেরার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু প্রতিবারই ইরান বা মার্কিন নৌবাহিনীর প্রয়োজনীয় অনুমতি না মেলায় ফিরে আসতে হয়েছে। ফলে এখনো পারস্য উপসাগরের ভেতরেই চরম ঝুঁকিতে অবস্থান করছে জাহাজটি। এদিকে দিন পেরিয়ে গেলেও জাহাজটি নিরাপদে বের হতে না পারায় দেশে থাকা নাবিকদের পরিবারের সদস্যদের উৎকণ্ঠাও কাটছে না।
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) সূত্রে জানা গেছে, ভারত থেকে পণ্য নিয়ে গত ২ ফেব্রুয়ারি হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করে ‘বাংলার জয়যাত্রা’। পরে কাতারের একটি বন্দর থেকে বাণিজ্যিক স্টিল কয়েল বোঝাই করে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছায় জাহাজটি। এর ঠিক পরদিনই (২৮শে ফেব্রুয়ারি) ইরানের ওপর আকস্মিক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে নিরাপত্তার চাদরে অবরুদ্ধ হয়ে পারস্য উপসাগরেই আটকা পড়ে বিএসসির এই জাহাজটি।
সমঝোতা হয়েছে, মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারের ঘোষণাও এসেছে, এমনকি কিছু বিদেশি জাহাজ চলাচলও শুরু করেছে। কিন্তু বাংলার জয়যাত্রার নাবিকদের ভাগ্যে স্বস্তির বদলে এখনো সঙ্গী কেবলই অপেক্ষা। কবে হরমুজ পুরোপুরি নিরাপদ হবে, কবে মিলবে ইরানি কর্তৃপক্ষের যাত্রার চূড়ান্ত অনুমতি আর কবে দেশের উদ্দেশ্যে রওনা হবে বাংলার জয়যাত্রা এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে প্রতিটি মুহূর্ত গুনছেন ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিক।


আপনার মতামত লিখুন :