ঢাকা শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩
Daily Global News

হজের নামে প্রতারণা: কোরবানির টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

ডিজিএন ডেস্ক

প্রকাশিত: জুন ২০, ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম

হজের নামে প্রতারণা: কোরবানির টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

“হজ করে আসলে মনের সন্তুষ্টির একটা বিষয় থাকে। কিন্তু আমাদের তো সেই অসন্তুষ্টিই রয়ে গেলো। এখন কী এই অসন্তুষ্টি নিয়েই বাকিটা জীবন পার করতে হবে?” আক্ষেপ ও বুকভরা কষ্ট নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন হজ করে সদ্য দেশে ফেরা নজরুল ইসলাম খান। চাকরির পেনশনের টাকাসহ জীবনের সব সঞ্চয় খরচ করে স্ত্রীকে নিয়ে সৌদি আরব গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু হজ শেষে তাঁর মনে এখন গভীর দুশ্চিন্তা বেসরকারি ট্রাভেল এজেন্সি কোরবানির টাকা হজম করে ফেলেনি তো? তাঁর হজ আদৌ কবুল হলো কি না, তা নিয়ে এখন কাটছে নির্ঘুম রাত।

শুধু নজরুল ইসলাম নন, সদ্য সমাপ্ত হজে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া হাজারো হাজির মনে এখন একই প্রশ্ন। সরকারি নিয়ম উপেক্ষা করে বেসরকারি হজ এজেন্সিগুলোর নানামুখী অনিয়ম, জালিয়াতি এবং কোরবানির টাকা আত্মসাতের এক ভয়াবহ চিত্র এবার সামনে এসেছে।

চলতি বছর থেকে সৌদি সরকার ‘নুসুক’ অ্যাপের মাধ্যমে কোরবানির কার্যক্রম পরিচালনা করা বাধ্যতামূলক করেছিল, যাতে হাজিরা সহজেই কোরবানি সম্পন্ন হওয়ার ডিজিটাল তথ্য দেখতে পারেন। বাংলাদেশ সরকারও প্রজ্ঞাপন জারি করে এজেন্সিগুলোকে নুসুক অ্যাপে তথ্য যুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু অনেক এজেন্সির নুসুক অ্যাপ চেক করে হাজিরা দেখেন, সেখানে কোরবানির কোনো তথ্যই নেই।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে বেশিরভাগ মানুষ ‘তামাত্তু’ (ওমরাহ ও হজ একসঙ্গে) হজ করতে যান, যেখানে পশু কোরবানি দেওয়া ধর্মীয়ভাবে বাধ্যতামূলক। অন্যদিকে ‘ইফরাদ’ হজে ওমরাহ না থাকায় কোরবানি বাধ্যতামূলক নয়। হাজিদের সরলতার সুযোগ নিয়ে অনেক এজেন্সি তাদের ‘ইফরাদ’ হাজি হিসেবে সৌদি সরকারের কাছে নিবন্ধন করেছে এবং কোরবানির জন্য নেওয়া সম্পূর্ণ টাকা আত্মসাৎ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী চিকিৎসক সানজিদুল আলম তাঁর পরিবার নিয়ে ‘আল মূলতাজিম হজ কাফেলা ট্রাভেলস’-এর মাধ্যমে হজে গিয়েছিলেন। তিনি জানান, “আমাদের কাফেলার সবাই তামাত্তু হজ করেছেন। অথচ এজেন্সি সৌদি সরকারকে তথ্য দিয়েছে আমরা নাকি ‘ইফরাদ’ হজ করেছি। যেহেতু এই হজে কোরবানি লাগে না, তাই আমাদের টাকাটা তারা পকেটে পুরেছে।”

জানা গেছে, আল মূলতাজিম তাদের ৮০ জন হজযাত্রীকে ‘দূয়ুফুর রহমান ট্রাভেলস’ নামের একটি বড় লিড এজেন্সির মাধ্যমে পাঠিয়েছিল। দূয়ুফুর রহমান এবার প্রায় ২২০০ জন হাজি পাঠালেও কোরবানি দিয়েছে মাত্র ১৩৫০ জনের। বাকি ৮৫০ জনকে তারা ‘কোরবানি ছাড়া’ ক্যাটাগরিতে দেখিয়েছে।

হজ পালনে কোনো ভুল বা ত্রুটি হলে তা শুদ্ধ করার জন্য অতিরিক্ত একটি কোরবানি দিতে হয়, যা ‘ভুলের দম’ নামে পরিচিত। এটি হজের পর পরিস্থিতি বুঝে দেওয়ার নিয়ম থাকলেও, অনেক এজেন্সি বাংলাদেশেই হাজিদের কাছ থেকে অগ্রিম ‘ভুলের দম’ ও অতিরিক্ত কোরবানির নামে চারটা পর্যন্ত কোরবানির টাকা কেটে রেখেছে।

ঢাকার বনশ্রীর বাসিন্দা একেএম আহসানুজ্জামান বলেন, “সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সাড়ে ৬ লাখ টাকার প্যাকেজের মধ্যেই কোরবানি থাকার কথা। কিন্তু আমাদের কাছ থেকে কোরবানি ছাড়াই নেওয়া হয়েছে ৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা। এরপর আবার আমাদের পরিবারের ৪ জনের কাছ থেকে অতিরিক্ত ৪টি কোরবানির টাকা নেওয়া হয়েছে। অথচ কোরবানি হওয়ার কোনো প্রমাণ তারা দেখাতে পারছে না।” এছাড়া অনেক সাধারণ হাজিকে নিজেদের আর্থিক লাভের সুবিধার্থে এজেন্সির ‘কর্মী’ বা ‘গাইড’ হিসেবে দেখানোর জালিয়াতিও করেছে কিছু প্রতিষ্ঠান।

হজ শেষে হাজিরা মক্কায় বাংলাদেশ হজ অফিসে লিখিত অভিযোগ দিলে নড়েচড়ে বসে এজেন্সিগুলো। দেশে ফেরার পর এখন ভুক্তভোগীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে টাকা ফেরত দিয়ে মুখ বন্ধ করার চেষ্টা চালাচ্ছে অভিযুক্তরা।

আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “৮০ জনের মধ্যে ৭৫ জনের কোরবানির টাকা আমরা মূল এজেন্সিকে দিয়েছি। বাকি ৫ জন আমাদের স্টাফ।” তবে হজের আগেই ‘দমের টাকা’ নেওয়ার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, “টাকা ফেরত দিচ্ছি ঠিকই, তবে তাদের কাছ থেকে কাগজে সই নিচ্ছি যেন তারা হজ অফিসের অভিযোগ তুলে নেয়। অভিযোগ না তুললে আমাদের লাইসেন্সের সমস্যা হবে।”

মূল এজেন্সি ‘দূয়ুফুর রহমান ট্রাভেলস’-এর কর্ণধার আব্দুর রহমানের কাছে নুসুক অ্যাপে তথ্য না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি অদ্ভুত এক অজুহাত দিয়ে বলেন, “নতুন নিয়ম হওয়ায় আইটি কর্মী সংকটের কারণে অ্যাপে তথ্য দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে মন্ত্রণালয় চাইলে আমরা প্রমাণ দেব।”

চলতি বছর বাংলাদেশ থেকে যাওয়া সাড়ে ৭৮ হাজার হজযাত্রীর মধ্যে প্রায় ৭৪ হাজারই গেছেন বেসরকারি এজেন্সির মাধ্যমে। কিন্তু এদের মধ্যে কতজনের কোরবানি ঠিকঠাক হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান এখন পর্যন্ত সরকারের কাছে নেই।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের হজ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব আয়াতুল ইসলাম বলেন, “বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই যে তামাত্তু হজ করেন, তা সবাই জানে। নির্দেশনা না মানলে এজেন্সির বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে কোন এজেন্সি জালিয়াতি করেছে, তা বের করার স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা আপাতত আমাদের নেই। হাজিরা সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ নিয়ে এলে আমরা তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”  সূত্র: বিবিসি।

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!