বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংক্রান্ত অধ্যাদেশটি এখন স্থায়ী আইনে পরিণত হয়েছে। মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে বিএনপি সরকারের অধীনে ‘সন্ত্রাস বিরোধী (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাসের মাধ্যমে দলটির রাজনীতিতে ফেরার শেষ আশাটুকুও আপাতত তিরোহিত হলো। তবে এই পদক্ষেপের ফলে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে বিএনপি কি তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে নিষিদ্ধ করার ঐতিহাসিক ‘দায়’ নিজের কাঁধে তুলে নিল?
পাস হওয়া বিলে স্পষ্ট বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা সত্তা সন্ত্রাসী কাজে জড়িত থাকলে সরকার প্রজ্ঞাপন দিয়ে তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে পারবে। নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা সত্তা কোনো প্রেস বিজ্ঞপ্তি, মিছিল, সভা-সমাবেশ, সংবাদ সম্মেলন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ধরনের প্রচারণা চালাতে পারবে না। মূলত ২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার যে কঠোর আইনি কাঠামো তৈরি করেছিল, বর্তমান বিএনপি সরকার কোনো পরিবর্তন ছাড়াই সেটিকে স্থায়ী রূপ দিল।
বিলটি পাসের পক্ষে যুক্তি দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, “আওয়ামী লীগকে যদি স্বাভাবিক রাজনীতি করতে দেওয়া হয়, তবে দুনিয়ার সব স্বৈরশাসককেই সম্মান করতে হবে। আমরা কেবল জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছি।”
তবে ভিন্নমত পোষণ করেছেন বিশিষ্ট আইনজীবী শাহদীন মালিক। তিনি বিবিসিকে বলেন, “বিএনপি না চাইলে এই বিল পাস হতো না। একটি দলের নেতাকর্মীরা অপরাধ করলে বিচার হতে পারে, কিন্তু দল নিষিদ্ধের এই ধারা ভবিষ্যতে অন্য দলগুলোর জন্যও বিপদজনক ক্ষেত্র প্রস্তুত করল।” তাঁর মতে, অনেকেই একে বিএনপির ‘প্রতিহিংসামূলক’ সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখতে পারেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আওয়ামী লীগকে মাঠের বাইরে রাখার পেছনে বিএনপির কয়েকটি কৌশলগত কারণ থাকতে পারে:
১. নির্বাচনী বৈতরণী: সামনেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন। তৃণমূল পর্যায়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভিত্তি এখনো শক্তিশালী, তাই তাদের অনুপস্থিতি বিএনপির জন্য নির্বাচনী জয় সহজ করবে।
২. জোটের চাপ: জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি জোটের মধ্যে আওয়ামী লীগ বিরোধী চরম মনোভাব বিদ্যমান। আওয়ামী লীগকে ছাড় দিলে এই মিত্রদের সাথে বিএনপির দূরত্ব তৈরি হতে পারত।
৩. নির্ঝঞ্ঝাট শাসন: দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি বর্তমানে শক্তিশালী কোনো বিরোধী পক্ষ ছাড়াই সংসদ পরিচালনা করছে, যা সরকারের জন্য স্বস্তিদায়ক।
বিলটি পাসের সময় বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর শফিকুর রহমান আলোচনার সুযোগ চাইলেও তা পাননি। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ তাঁর বক্তব্যে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এটি একটি ‘গণহত্যাকারী সন্ত্রাসী সংগঠন’ নিষিদ্ধ করার ধারাবাহিকতা মাত্র। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, আইসিটি অ্যাক্টেও সংগঠনটির বিচারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ মনে করেন, এখানে ‘দায়’-এর কোনো প্রশ্নই নেই। তাঁর মতে, যারা জনগণের অধিকার হরণ করেছে এবং গণহত্যার মতো অপরাধের সাথে জড়িত, তাদের রাজনীতি করার নৈতিক অধিকার থাকে না। তবে তিনি এ-ও যোগ করেন, ভবিষ্যতে পরিস্থিতি পরিবর্তন হলে এই নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার সম্ভাবনাও নাকচ করা যায় না।
১৯৭৫ সালে দল নিষিদ্ধ করার জন্য বিএনপি সবসময় আওয়ামী লীগের সমালোচনা করে এসেছে। এখন ৫২ বছর পর এসে খোদ বিএনপিই আরেকটি দলকে নিষিদ্ধ করার আইনি ভিত্তি দিল। এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে ‘স্বৈরাচারমুক্ত’ করবে নাকি ‘প্রতিপক্ষহীন’ এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দেবে, তা সময়ই বলে দেবে। সূত্র: বিবিসি


আপনার মতামত লিখুন :