মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিমুখী সংঘাতের কারণে বিশ্বজুড়ে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা থাকলেও বাংলাদেশে জ্বালানি তেল আমদানির চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। গেল বছরের তুলনায় এ বছর জ্বালানি আমদানি বেড়েছে আড়াই গুণ। এছাড়া এলএনজি ও এলপিজি আমদানিতে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এত বিপুল পরিমাণ আমদানির পরও দেশের বাজারে জ্বালানি নিয়ে অস্থিরতা ও লম্বা লাইন কমছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকটের মূলে সরবরাহের ঘাটতি নয়, বরং তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা থেকে সৃষ্ট আতঙ্ক এবং এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর মজুত করার প্রবণতা দায়ী।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই দেশে ২৫ লাখ টনের মতো জ্বালানি আমদানি হয়েছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ে ছিল মাত্র ১০ লাখ টন। বিশেষ করে গেল মার্চ মাসেই ৩ লাখ ২৭ হাজার টন জ্বালানি তেল নিয়ে ১১টি জাহাজ বন্দরে ভিড়েছে। পাশাপাশি ভারত থেকে পাইপলাইনে এসেছে আরও ২২ হাজার টন ডিজেল।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ আল আমিন জানান, পরিশোধিত ও অপরিশোধিত উভয় ধরনের জ্বালানি আমদানিতেই বড় প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। তিন মাসেই গত বছরের তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ বেশি তেল দেশে এসেছে।
মার্চ মাসে চট্টগ্রাম বন্দরে মোট ৪২টি জ্বালানি বহনকারী জাহাজ এসেছে। এর মধ্যে ৯টি এলএনজি এবং ১৪টি এলপিজির জাহাজ রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমডোর আহমেদ আমিন আবদুল্লাহ জানান, সম্প্রতি আসা জাহাজগুলোর বেশিরভাগই আসছে পূর্বদিকের দেশগুলো (যেমন মালয়েশিয়া) থেকে। মধ্যপ্রাচ্যের রুট ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সরকার যে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে, এটি তারই প্রতিফলন।
জ্বালানি আমদানিতে রেকর্ড হওয়া সত্ত্বেও কেন বাজারে তেলের সংকট? এমন প্রশ্নের উত্তরে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মনজারে খোরশেদ আলম বলেন, “সমস্যাটি সরবরাহের নয়, বরং আস্থার। দেশের বাজারে এখন পর্যন্ত তেলের দাম না বাড়লেও মজুতদাররা মনে করছে ভবিষ্যতে দাম বাড়বে। ফলে তারা তেল মজুত করছে। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যেও আতঙ্ক কাজ করছে যে তেল হয়তো পাওয়া যাবে না।” তিনি মনে করেন, কর্তৃপক্ষ সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করতে ব্যর্থ হওয়ায় এই জটিলতা কাটছে না।
জ্বালানি আমদানির এই বাড়তি তোড়জোড়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় চাপ তৈরি হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এলএনজি ও এলপিজি আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে ভর্তুকি দিয়ে দাম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হলেও, অর্থমন্ত্রী ইতোমধ্যে সতর্ক করেছেন যে দীর্ঘমেয়াদে এই চাপ ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেবল আমদানি বাড়িয়ে সংকট সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। বাজারে সঠিক সরবরাহ চেইন নিশ্চিত করা এবং মজুতদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। সেই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা ফেরাতে সরকারকে নিয়মিত ও স্বচ্ছ তথ্য প্রদান করতে হবে।


আপনার মতামত লিখুন :