ঢাকা সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
Daily Global News

ট্রাম্পের ‘চাপের কূটনীতি’ কি ইরানে এসে মুখ থুবড়ে পড়ল?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: মে ১৮, ২০২৬, ০১:১৫ পিএম

ট্রাম্পের ‘চাপের কূটনীতি’ কি ইরানে এসে মুখ থুবড়ে পড়ল?

দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক ও হুংকারনির্ভর আলোচনার কৌশল বেশ আলোচনায়। শুল্ক যুদ্ধ থেকে শুরু করে বিভিন্ন আঞ্চলিক সশস্ত্র সংঘাত নানা ইস্যুতে বিশ্বের অনেক দেশকে চাপ দিয়ে ছাড় আদায়ে সফল হয়েছেন তিনি। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের এই ‘ম্যাক্সিমাম প্রেশার’ বা চরম চাপ প্রয়োগের কূটনীতি যেন এক দুর্ভেদ্য দেয়ালে এসে ঠেকেছে। ১১ সপ্তাহ ধরে চলা এই মধ্যপ্রাচ্য সংকট এখন কেবল ওয়াশিংটন-তেহরানের অচলাবস্থাই তৈরি করেনি, বরং বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহকেও বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস ট্রাম্পের এই কৌশলের পক্ষে সাফাই গেয়ে দাবি করেছেন যে, ইরান সমঝোতার জন্য ক্রমেই ‘মরিয়া’ হয়ে উঠছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ ভিন্ন কথা বলছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের আলোচনার প্রধান বাধাগুলোর একটি হলো ইরানি শাসকদের মনস্তত্ত্ব এবং তাদের জাতীয় অহংকার। মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, নিহত হয়েছেন অনেক শীর্ষ নেতা। এত কিছুর পরও নিজেদের জনগণের কাছে মর্যাদা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা ইরানি শাসকদের জন্য অস্তিত্বের লড়াই।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক শীর্ষ আলোচক রব ম্যালি-যিনি ওবামা ও বাইডেন প্রশাসনে কাজ করেছেন, তিনি বলেন, “কোনো সরকারই বিশ্বের কাছে এটা দেখাতে চায় না যে তারা আত্মসমর্পণ করেছে। ট্রাম্পের চূড়ান্ত বিজয়ের আকাঙ্ক্ষা এই যৌক্তিক সমঝোতার পথ বন্ধ করে দিচ্ছে।”

এদিকে, ট্রাম্প অভ্যন্তরীণভাবেও চাপের মুখে রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের চড়া মূল্য এবং আরেকটি অজনপ্রিয় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার কারণে আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েছে। প্রতিনিধি পরিষদে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে তার দল রিপাবলিকান পার্টিও।

সংকটপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে ট্রাম্পের অনেক কঠোর ও অসংলগ্ন বার্তা এসেছে তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ থেকে, যার বেশিরভাগই পোস্ট করা হয়েছে মধ্যরাতের পর। গত মাসে তিনি হঠাৎ করে ইরানের বন্দরগুলো অবরোধের ঘোষণা দিলে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি নতুন করে হুমকির মুখে পড়ে। এমনকি গত সোমবার ইরানি কর্মকর্তাদের দেওয়া শান্তি প্রস্তাবকে সরাসরি ‘আবর্জনা’ বলে উড়িয়ে দেন ট্রাম্প।

সাবেক মার্কিন মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ডেনিস রস মনে করেন, প্রেসিডেন্টের এই কৌশলগত ধৈর্যের অভাব এবং বক্তব্যের অসংগতি তার নিজের দেওয়া বার্তাকেই দুর্বল করে দিচ্ছে। গত মাসে তুরস্ক সফরের সময় ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইদ খতিবজাদেহও সাংবাদিকদের টিপ্পনী কেটে বলেছিলেন, “(ট্রাম্প) খুব বেশি কথা বলেন।”

গত মাসে ট্রাম্প সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মন্তব্যটি করেন যখন তিনি হুমকি দেন যে, কোনো চুক্তিতে না পৌঁছালে ইরানের ‘পুরো সভ্যতা’ ধ্বংস করে দেওয়া হবে। হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা পরে স্বীকার করেন, এটি কোনো পরিকল্পিত জাতীয় নিরাপত্তাকৌশল ছিল না, ট্রাম্প তাৎক্ষণিকভাবে এই পোস্ট করেছিলেন।

এমনকি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মধ্যেই ইস্টার সানডেতে তিনি অশালীন ভাষায় ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামো ধ্বংসের হুমকি দেন। গত শুক্রবার চীন সফর শেষে এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, “যদি ইরান থেকে বিশাল এক আলোর ঝলক বের হতে দেখেন, তবে বুঝবেন যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়েছে।” অনেকেই একে পারমাণবিক হামলার পরোক্ষ হুমকি হিসেবে দেখছেন।

ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান কিংবা গাজা যুদ্ধবিরতির আলোচনায় ট্রাম্পের এই ‘ভীতি প্রদর্শন’ কার্যকর হলেও ইরানের ক্ষেত্রে তা খাটছে না। এর প্রধান কারণ দেশটির ধর্মীয় ও সামরিক প্রতিষ্ঠানের গভীর প্রভাব এবং নিজেদের দীর্ঘ ইতিহাস নিয়ে জাতীয় গর্ব।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক কর্মকর্তা নেট সোয়ানসন সতর্ক করে বলেন, “অনেকের মধ্যে একটা ভুল ধারণা আছে যে ইরানের ওপর যথেষ্ট চাপ দিলে তারা আত্মসমর্পণ করবে। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বিষয়গুলো এভাবে কাজ করে না।”

তাছাড়া, বেইজিং সফরের সময় ট্রাম্প ইরান নিয়ে কিছুটা সংযত ছিলেন। কারণ চীন তেহরানের অন্যতম বড় মিত্র এবং ইরানি তেলের প্রধান ক্রেতা। অন্যদিকে ইরান নিজের টিকে থাকাকেই তাদের বিজয় হিসেবে দেখছে এবং হরমুজ প্রণালির ওপর এখনো তাদের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, যা বিশ্ববাণিজ্যের জন্য সবচেয়ে বড় দর-কষাকষির হাতিয়ার।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প যদি সত্যিই এই সংকটের একটি টেকসই ও শান্তিপূর্ণ সমাধান চান, তবে প্রকাশ্য বক্তব্য ও তাৎক্ষণিক সাক্ষাৎকারে তীব্র ভাষার ব্যবহার কমাতে হবে। অন্যথায়, এই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হয়ে বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে এক নজিরবিহীন বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেবে।

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!