বিচারিক ইতিহাসে এক অনন্য ও নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে রাজধানীর পল্লবীতে ৭ বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও নৃশংসভাবে হত্যার মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। নৃশংস সেই ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় আজ রবিবার (৭ জুন) ঢাকার একটি আদালত এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করলেন।
মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক প্রধান আসামি সোহেল রানাকে ৫ লাখ টাকা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন। অতি দ্রুততম সময়ে বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে এই রায় আসায় আদালত অঙ্গনসহ সচেতন মহলে সন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে।
আদালতের রায় ঘোষণার পর রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (স্পেশাল পিপি) মোহাম্মদ আজিজুর রহমান দুলু সাংবাদিকদের বলেন, “আদালত স্পষ্টভাবে বলেছেন যে ময়নাতদন্ত (অটোপসি) রিপোর্টে চিকিৎসক রামিসার দেহে নির্মম ধর্ষণের আলামত পেয়েছেন। এই রায়ে আমরা সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট। ট্রাইব্যুনাল ইতিহাসের অন্যতম দ্রুততম সময়ে এই রায় ঘোষণা করেছেন।”
তিনি আরও বলেন, “আদালত রায়ের শুরুতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। আদালত বলেছেন, শিশুদের অধিকার রক্ষা এবং তাদের নিরাপত্তা দেওয়া রাষ্ট্রের মৌলিক উদ্দেশ্যগুলোর একটি। শিশুদের ওপর এমন পাশবিক অপরাধ হলে কোনো দয়া-দাক্ষিণ্য না দেখিয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। তারই নিমিত্তে ট্রাইব্যুনাল অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন।”
এই স্পর্শকাতর রায়কে কেন্দ্র করে আজ সকাল থেকেই পুরো আদালত পাড়া ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেয় ঢাকা মহানগর পুলিশ। রায় ঘোষণাকে সামনে রেখে সকালে দুই আসামিকে কড়া পাহারায় প্রিজন ভ্যানে করে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় আনা হয়। রায় ঘোষণার সময় কাঠগড়ায় আসামিরা উপস্থিত ছিলেন। আদালতে উপস্থিত ছিলেন শিশু রামিসার পিতা ও মামলার বাদী আব্দুল হান্নান মোল্লা।
মামলার এজাহার ও চার্জশিটের বিবরণ অনুযায়ী, গত ১৯শে মে সকালে পল্লবীর মিরপুর-১১ নম্বর এলাকায় নিজেদের বাসার পাশের ফ্ল্যাটের একটি কক্ষ থেকে পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারের রক্তাক্ত ও খণ্ডিত মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘাতক সোহেল রানা শিশুটিকে ঘরে নিয়ে গিয়ে প্রথমে ধর্ষণ করে এবং পরে তার গলা কেটে মরদেহ কয়েক টুকরো করে।
রামিসার চিৎকার শুনে যখন পরিবার ও প্রতিবেশীরা ছুটে আসে, ততক্ষণে সোহেল রক্তমাখা মরদেহ বিছানার নিচে লুকিয়ে ফেলে। পরে পুলিশ এসে টয়লেটের ভেতরের একটি বালতি থেকে শিশুটির বিচ্ছিন্ন মাথা উদ্ধার করে। ঘটনার পর ঘাতক সোহেল পালিয়ে গেলেও ১০ ঘণ্টার মধ্যে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গ্রেফতারের পর সে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছিল।
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। ঘটনার পর পরই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে স্বরাষ্ট্র ও আইনমন্ত্রীকে সাথে নিয়ে পল্লবীতে ভুক্তভোগী পরিবারের সাথে দেখা করেন এবং দ্রুততম সময়ে বিচারের স্পষ্ট আশ্বাস দেন।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারকে এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমার নির্দেশ দিলে ২৪শে মে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে পুলিশ। চার্জশিটে মূল আসামি করা হয় সোহেল রানাকে এবং আলামত নষ্ট ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে স্বামীকে সহযোগিতার অপরাধে অভিযুক্ত করা হয় তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে।
গত ১লা জুন ট্রাইব্যুনাল চার্জশিট আমলে নেওয়ার পর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে বিচারিক কাজ শেষ হয়। গত ২রা জুন মামলার প্রথম শুনানিতেই শিশুটির বাবা-মা এবং তদন্ত কর্মকর্তাসহ ১৬ জন সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ড করেন আদালত। সর্বশেষ রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে আজ এই যুগান্তকারী রায় ঘোষণা করা হলো, যা বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় দ্রুততম সময়ে রায় প্রদানের ক্ষেত্রে এক অনন্য মাইলফলক হয়ে থাকবে।


আপনার মতামত লিখুন :