ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
Daily Global News
স্থানীয় নির্বাচনের বিধিমালা চূড়ান্ত

আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের অংশ নেয়ায় বাধা নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: জুন ১০, ২০২৬, ০৯:৫৬ পিএম

আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের অংশ নেয়ায় বাধা নেই

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এবার মাঠপর্যায়ের স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের চূড়ান্ত রোডম্যাপ তৈরি করেছে নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আগামী আগস্ট মাসেই ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার মধ্য দিয়ে দেশজুড়ে শুরু হতে যাচ্ছে স্থানীয় সরকারের ভোটযজ্ঞ। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে বুধবার নির্বাচন কমিশন দলীয় প্রতীক ছাড়া নির্দলীয়ভাবে ভোট গ্রহণের আচরণবিধি ও বিধিমালা চূড়ান্ত করেছে।

নতুন এই বিধিমালা অনুযায়ী, নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তির ওপর বৈষম্যমূলক নিষেধাজ্ঞা থাকছে না। ফলে, দলগত কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও যদি ব্যক্তিগতভাবে প্রার্থী হওয়ার আইনি যোগ্যতা রাখেন, তবে তাঁদের নির্বাচনে অংশ নিতে কোনো বাধা থাকবে না।

নতুন এই বিধিমালা প্রণয়ন কমিটির প্রধান ও নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ স্পষ্ট জানিয়েছেন, আচরণবিধিতে কোনো দল বা ব্যক্তিকে বাদ দেওয়ার মতো কোনো বিধান রাখা হয়নি।

ইসি সূত্র জানায়, প্রাথমিক খসড়ায় প্রস্তাব করা হয়েছিল যে প্রার্থীদের ‘নিষিদ্ধ বা নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই’ মর্মে একটি অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করতে হবে। তবে কমিশনের দীর্ঘ বৈঠকের পর বুধবার এই বিতর্কিত শর্তটি চূড়ান্ত বিধিমালা থেকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়েছে।

কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ গণমাধ্যমকে বলেন, “আমরা দেখব না কে কোন দল করে। প্রার্থী হওয়ার যে সাধারণ যোগ্যতা, তা যদি থাকে তবে তিনি যে দলেরই হোন না কেন নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। এমনকি তিনি হিন্দু না মুসলমান, ছেলে না মেয়ে, কোন দল করেন নাকি করেন না সেটি আমাদের দেখার বিষয় নয়। শুধুমাত্র হলফনামায় একটি অঙ্গীকার থাকবে যে, প্রার্থীরা নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলবেন।”

এ বিষয়ে গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানও সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে বলেন, “স্থানীয় সরকার নির্বাচন যেহেতু সম্পূর্ণ নির্দলীয়, তাই একজন ব্যক্তি যদি আওয়ামী লীগের হয়েও নির্দলীয়ভাবে অংশ নিতে চান, তবে তিনি পারবেন। কারণ এখানে কেউই দলের কথা বলতে পারবেন না।”

২০১৫ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার আইন সংশোধন করে স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক চালু করেছিল। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশের মাধ্যমে তা বাতিল করে এবং পরে নতুন সংসদে বিল পাসের মাধ্যমে আবারও নির্দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের আদি ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা হয়।

সেই নতুন আইন অনুযায়ী ইসির চূড়ান্ত করা বিধিমালায় যেসব বড় পরিবর্তন আসছে: নতুন বিধিমালায় ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, ব্যালট পেপারের মাধ্যমেই সনাতন পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণ হবে। নির্বাচনী পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে এবং খরচ কমাতে স্থানীয় নির্বাচনে কোনো ধরনের পোস্টার বা ব্যানার ব্যবহার করা যাবে না।

আগে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য সংশ্লিষ্ট এলাকার ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষরের যে জটিল নিয়ম ছিল, তা বাতিল করা হয়েছে। নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্রের জামানতের পরিমাণ আগের চেয়ে বাড়ানো হচ্ছে। এবারের নির্বাচনে অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে না এবং পোস্টাল ব্যালটে ভোটদানের সুযোগও থাকছে না।

এই খসড়া বিধিমালাটি শিগগিরই রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের জন্য ইসির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। পরবর্তীতে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে এটি চূড়ান্ত গেজেট আকারে প্রকাশ পাবে। ইউনিয়ন পরিষদের পর ধাপে ধাপে পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি করপোরেশনের জন্যও একই রূপরেখায় বিধিমালা তৈরি করা হবে।

ভোটের মাঠে ‘কামব্যাক’ করতে চায় আওয়ামী লীগ

নিবন্ধনের যোগ্যতা হারিয়ে গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে না পারা আওয়ামী লীগ এই স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে রাজনীতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে। আত্মগোপনে থাকা দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম জানিয়েছেন, দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা ইতিমধ্যেই নেতাকর্মীদের স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দিয়েছেন।

বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, “কর্মী-সমর্থকদের মধ্য থেকে এই নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার ব্যাপারে আমাদের জোর প্রস্তুতি চলছে। অন্যান্য প্রগতিশীল দলগুলোর সাথেও আমাদের আলাপ-আলোচনা হচ্ছে।” তবে এই প্রস্তুতির পাশাপাশি আওয়ামী লীগের ওপর থেকে রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

নির্বাচন বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হলেও মাঠপর্যায়ে এটি শেষ পর্যন্ত দলীয় রূপই নেবে। আর এতে করে দেশের রাজনৈতিক ও ভোটের সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে।

নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম বলেন, “জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমর্থকরা ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যদি তাদের প্রার্থীরা অংশ নেয়, তবে সমর্থকরা আবার নিজেদের পছন্দের মানুষকে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের জন্য রাজনীতিতে এটি একটি বড় ‘কামব্যাক’ বা পুনরুত্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে।”

অন্যদিকে, তফসিল ঘোষণা না হলেও ইতিমধ্যেই বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা মাঠপর্যায়ে ব্যানার-ফেস্টুন ছাড়াই অনানুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা ও গণসংযোগ শুরু করে দিয়েছেন।

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!