বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত দিয়ে দফায় দফায় জোরপূর্বক লোকজন ঠেলে দেওয়ার (পুশ-ইন) চেষ্টা চালাচ্ছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। দেশের উত্তরাঞ্চলের কুড়িগ্রাম, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের ঝিনাইদহ, যশোর, জয়পুরহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নেত্রকোনা ও সিলেট সীমান্তে একের পর এক বিএসএফের এই পুশ-ইন চেষ্টাকে কেন্দ্র করে সীমান্তজুড়ে নতুন করে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
ঠিক যখন ভারতের রাজধানী নতুন দিল্লিতে বিএসএফ এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক পর্যায়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক চলছে, ঠিক সেই সময়েই ভারতের পক্ষ থেকে এমন উসকানিমূলক আচরণ দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে এক বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।
সীমান্তের এই উত্তেজনার মধ্যেই জল ঢালার পরিবর্তে বিতর্ক উসকে দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি প্রকাশ্য দাবি করেছেন যে, ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের আওতার বাইরে থাকা প্রায় ৪ হাজার ৮০০ জনকে ইতিমধ্যেই বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। তিনি আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আরও ৮৩৬ জনকে বর্তমানে হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হয়েছে, যাদের খুব শীঘ্রই সীমান্তের ওপারে ‘পুশ ব্যাক’ করা হবে।
বিএসএফের এই অন্যায্য তৎপরতার মুখে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। গত রোববার গভীর রাতে কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তে বিএসএফের একটি বড় পুশ-ইন চেষ্টা কঠোরভাবে প্রতিহত করেছে বিজিবি। এছাড়া পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওয়ের মশালগাঁও সীমান্তে বাংলাদেশে ঢোকানোর জন্য জড়ো করা ব্যক্তিদের বাংলাদেশের কড়া প্রতিরোধের মুখে ভারতের ভেতরেই ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে বিএসএফ।
এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে বিজিবি স্পষ্ট জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং দুই দেশের বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার পরিপন্থী যেকোনো অবৈধ পুশ-ইন প্রচেষ্টা বাংলাদেশের মাটিতে কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে কিছুটা স্থবিরতা এসেছিল। তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে নতুন সরকারের অধীনে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের সফর ও কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে সম্পর্ক আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করে। কিন্তু গত মাস থেকে হঠাৎ একদিনেই অন্তত ১০টি স্থানে পুশ-ইন চেষ্টার ঘটনায় কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে—এর পেছনে ভারতের আসল উদ্দেশ্য কী?
সাবেক কূটনীতিক ও বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তার পানি বণ্টন ও গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধির মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক ইস্যুগুলো নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। ঠিক এই সময়ে সীমান্তে পুশ-ইনের মতো ঘটনা ঘটিয়ে আলোচনার টেবিলে ঢাকাকে কোণঠাসা করার জন্য এটি দিল্লির একটি ‘চাপ সৃষ্টির কৌশল’ হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. লাইলুফার ইয়াসমিন মনে করেন, সীমান্তে হঠাৎ করে এভাবে পুশ-ইন বৃদ্ধি অত্যন্ত বিস্ময়কর। এটি দ্বিপাক্ষিক আলোচনার আগে বৃহত্তর কূটনৈতিক চাপ তৈরির সুদূরপ্রসারী কৌশল হতে পারে। সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদের মতে, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের এই অবস্থান দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।
সীমান্তে বিএসএফের এই বেআইনি আচরণ নিয়ে অন্তরাল থেকে কূটনৈতিক যুদ্ধ শুরু করেছে ঢাকা। আজ মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানান, পুশ-ইন বন্ধে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে ইতিমধ্যেই ১২ থেকে ১৩টি কড়া চিঠি দেওয়া হয়েছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, “ভারত সরকার যদি বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে (সিরিয়াসলি) নেয়, তাহলে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া সহজ হবে। যদি বাংলাদেশ বা ভারতের কোনো অবৈধ নাগরিক থেকে থাকে, তবে তা প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক নিয়ম ও বিদ্যমান প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সমাধান করা উচিত। পুশ-ইনের মাধ্যমে জোর করে মানুষ ঠেলে দিলে সমস্যা সমাধান না হয়ে বরং সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
এদিকে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ভারতের এই পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “কাউকে যদি অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে দাবি করা হয়, তবে ভারত সরকারকে প্রমাণসহ সেই তালিকা আগে বাংলাদেশ সরকারের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। জোরপূর্বক সীমান্তে পুশ-ইন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানাচ্ছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ইতিমধ্যেই বিজিবিকে সীমান্তে ‘জিরো টলারেন্স’ বা কঠোর অবস্থান বজায় রাখার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে কূটনৈতিক উপায়ে এই সংকটের দ্রুত সমাধান না হলে, তা দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন সংকটের জন্ম দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।


আপনার মতামত লিখুন :