ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
Daily Global News
নতুন সরকারের ১০০ দিন

সুশাসন ও নিরাপত্তা নিয়ে টিআইবির উদ্বেগ, ২ মাসে ৬০৫ হত্যা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: জুন ৭, ২০২৬, ০৮:৪৬ পিএম

সুশাসন ও নিরাপত্তা নিয়ে টিআইবির উদ্বেগ, ২ মাসে ৬০৫ হত্যা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনের শাসনকালে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার ও আইনশৃঙ্খলার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি জানিয়েছে, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে মব জাস্টিস বা মব সহিংসতা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। একই সাথে প্রশাসনে পদায়ন ও নিয়োগের ক্ষেত্রে অতীতের মতোই ‘দলীয়করণের’ প্রতিফলন দেখা গেছে।

আজ রবিবার (৭ জুন) দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে টিআইবি আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সরকারের ১০০ দিন: সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “নতুন সরকার গঠনের একশ দিনের মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে এখনো পর্যন্ত দৃশ্যমান ও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকার যেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং তথ্য অধিকার কমিশন স্থবির করে রাখা সেই নেতিবাচক ধারাবাহিকতায় এবার নতুন করে যুক্ত হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের স্থবিরতার অবস্থা। এটি কোনো অবস্থাতেই বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।”

প্রশাসনিক ক্ষেত্রে আগের মতোই রাজনৈতিক প্রভাব ও পদায়নের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “এই সরকার গঠনের পর প্রশাসনে বেশ কিছু উচ্চপর্যায়ের নিয়োগ ও পদায়ন এমনভাবে করা হয়েছে, যা আসলে পরিষ্কারভাবে বিগত আমলগুলোর দলীয়করণের পুরোনো অনৈতিক চর্চারই একটি নতুন প্রতিফলন। দেশের সাধারণ মানুষের কাছে এটি মোটেও প্রত্যাশিত ছিল না।”

টিআইবির প্রতিবেদনে দেশের সমকালীন আইনশৃঙ্খলার এক আশঙ্কাজনক ও ভয়াবহ পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের গত মার্চ ও এপ্রিল—এই মাত্র দুই মাসেই দেশে নারকীয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ৬০৫টি।

এছাড়াও একই সময়ে সারা দেশে অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ১৯৬টি, ডাকাতি ৯০টি এবং ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে ৯০টি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্বলতা বা চেইন অব কমান্ডের সংকটের কারণে গত দুই মাসে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ১২৯টি।

মার্চ ও এপ্রিল মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের গ্রাফ আশঙ্কাজনকভাবে ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। এই দুই মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৮ থেকে বেড়ে ১০২ জন, গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩০ থেকে ৩৬ জন নারী। এছাড়া সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে দেশে শিশু ধর্ষণের ঘটনা ৪৯ থেকে লাফিয়ে বেড়ে ৭১ জনে দাঁড়িয়েছে।

দেশে চলমান ‘মব সংস্কৃতি’ (উচ্ছৃঙ্খল জনতার আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া) এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “গণপিটুনি, মব সহিংসতা ও মব জাস্টিসের বিরুদ্ধে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে বারবার কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা ও হুঁশিয়ারি দেওয়া হলেও, মাঠপর্যায়ে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন তা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ঐতিহ্যবাহী মাজার এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর পরিকল্পিত হামলার ঘটনা এখনও অব্যাহত রয়েছে, যা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সুশাসনের ধারণার পরিপন্থী।”

টিআইবি মনে করে, নির্বাচনী ইশতেহার ও জনগণের আকাঙ্খার সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে সরকারকে অবিলম্বে দলীয়করণের মানসিকতা থেকে বের হয়ে স্বাধীন কমিশনগুলোকে সচল করতে হবে এবং মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে কঠোরতম রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখাতে হবে।

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!