ইতালিতে বসবাসরত অভিবাসী নারীদের জন্য নতুন একটি দেশে পা রাখা মানেই শুধু জায়গা বদল নয়, অনেক সময় তা হয়ে ওঠে সামাজিক ও পারিবারিক চাপ থেকে কিছুটা মুক্তির সুযোগ। বিশেষ করে দ্বিতীয় প্রজন্মের বাংলাদেশি নারীরা নিজেদের জীবনে সংস্কৃতি, পারিবারিক ঐতিহ্য, স্বাধীনতা ও ক্যারিয়ারের মধ্যে এক জটিল ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছেন। এই যাত্রা সহজ নয়, তবে তারা যে স্বাধীনতার স্বাদ পান, তা অনেক সময় গভীরভাবে মুক্তিদায়ক।
রোমের মন্টাগনোলা এলাকার বাসিন্দা লিন্থা তেমনই একজন দ্বিতীয় প্রজন্মের বাংলাদেশি নারী। তিনি বলেন, সমাজে প্রচলিত নানা স্টেরিওটাইপ, সম্মতি বা নারীর অধিকার নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে অনেক সময় নিজের পরিবারেই এসব প্রসঙ্গ তুলতে হয়। তবে তিনি জানেন, তার মতো করে কথা বলার সুযোগ অনেক মেয়েরই নেই।
লিন্থা সম্প্রতি একটি স্থানীয় সামাজিক কেন্দ্র ‘ফাতিমা টু’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, যা ইতালির জাতীয় সংগঠন আরচি নাজিওনালের একটি প্রকল্প। এই প্রকল্পটি মূলত লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য ও সামাজিক সচেতনতা নিয়ে কাজ করে। লিন্থার ভাষায়, এই জায়গাটি তার জন্য নিরাপদ এক পরিসর, যেখানে মেয়েরা ঘরের ভেতরে বলা যায় না—এমন বিষয়গুলো নিয়ে খোলাখুলি কথা বলতে পারে। ইতালীয় সংস্কৃতি ও বাঙালি সংস্কৃতির পার্থক্য, ব্যক্তিগত হতাশা কিংবা সীমাবদ্ধতা—সবকিছুই এখানে আলোচনার জায়গা পায়।
ইতালিতে বসবাসরত অনেক বাংলাদেশি পরিবার তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তিত। কাজের সুযোগ ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাবের কারণে তারা অনেক সময় অন্য ইউরোপীয় দেশে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। জার্মানি এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে জনপ্রিয় গন্তব্যগুলোর একটি, যেখানে বছরের পর বছর ধরে একটি বড় বাংলাদেশি কমিউনিটি গড়ে উঠেছে।
লিন্থার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় প্রজন্মের অভিজ্ঞতা তার সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। প্রশিক্ষণ শেষে তিনি ‘ফাতিমা টু’ প্রকল্পে যুক্ত হন এবং ছোট ছোট সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে কমিউনিটিতে সচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখেন। কিছু তরুণী যারা আঁকায় আগ্রহী, তাদের নিয়ে সৃজনশীল কর্মশালাও আয়োজন করা হয়। প্রকল্পকর্মী ক্লারা বলেন, শিল্প এখানে রাজনৈতিক ভাষা হয়ে উঠেছে, যা মেয়েদের ভাবনা প্রকাশের সুযোগ দিয়েছে এবং তাদের আত্মবিশ্বাস ও পরিচয়ের অনুভূতি জোরদার করেছে।
অনেক পরিবার মেয়েদের পড়াশোনায় উৎসাহ দিলেও বাস্তবতা ভিন্ন। আরচির তথ্য অনুযায়ী, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কিশোরী এখনো অল্প বয়সে বা পারিবারিকভাবে নির্ধারিত বিয়ের চাপের মুখে পড়ে। সাম্প্রতিক এক ঘটনায় দেখা যায়, ইতালির নাগরিকত্ব পাওয়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক তরুণীকে পরিবার বাংলাদেশে নিয়ে গিয়ে জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। দীর্ঘ নির্যাতনের পর তিনি ইতালিতে ফিরতে সক্ষম হন। ইউরোপে জোরপূর্বক বিয়ের ঘটনা কমলেও ২০২০ সালে এখনও হাজারো এমন ঘটনার নথিভুক্ত তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রকল্পকর্মীরা শুরুতে তরুণ বাংলাদেশি মেয়েদের যুক্ত করতে দ্বিধায় থাকলেও মেয়েদের সাহস ও আগ্রহ তাদের বিস্মিত করে। নারীর স্বাস্থ্য, মাসিক, গর্ভপাতের অধিকার, বর্ণবাদ, ইসলামবিদ্বেষ, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ও জোরপূর্বক বিয়ের মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলো তারা খোলাখুলিভাবে আলোচনায় আনতে চেয়েছে।
এই অংশগ্রহণ নিয়ে পরিবারগুলোর প্রতিক্রিয়া ছিল ভিন্ন ভিন্ন। লিন্থা জানান, তার মা এতে খুশি হলেও পরিবারের পুরুষ সদস্যরা বিষয়টি ভালোভাবে নেননি। তাদের মতে, এসব বিষয় নিয়ে কথা বলা বা নারীবাদ নিয়ে আলোচনা করা মেয়েদের জন্য ‘অনুচিত’, যা তারা বিদ্রোহ হিসেবে দেখেন।
লিঙ্গ সমতা নিয়ে কথা বলা তরুণীরা মূলত তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির প্রচলিত নিয়মকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। তাই অনেক সময় নারীরাই নিজেদের ভূমিকা নতুন করে ভাবতে ভয় পান। লিন্থা মনে করেন, প্রথম প্রজন্মের বাংলাদেশি নারীদের তুলনায় তিনি অনেক বেশি ভাগ্যবান। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বহু নারী আছেন যারা স্বামী বা পরিবারের বাধায় কাজ করতে পারেননি, ভাষা শেখেননি, ফলে ১৫-২০ বছর ইতালিতে থেকেও তারা সমাজের সঙ্গে যোগাযোগহীন থেকে গেছেন।
সামসার মতো অনেক নারীর কাছে ইতালি ছিল কেবল একটি মধ্যবর্তী দেশ। পরে পরিবার নিয়ে তিনি ফ্রাঙ্কফুর্টে চলে যান। তার মতে, সন্তানদের ভালো ভবিষ্যতের কথা ভেবেই এই সিদ্ধান্ত। তবে তিনি ভবিষ্যতে আবার সিসিলিতে ফিরে যেতে চান, যেখানে তিনি দীর্ঘ ১৬ বছর কাটিয়েছেন। তার ১২ বছরের মেয়ে চারটি ভাষায় দক্ষ এবং পরিবারকে ভাষাগতভাবে সাহায্যও করে।
জার্মানির স্টুটগার্টে বসবাসরত হালিমার মতে, সন্তান লালনের জন্য জার্মানি একটি ভালো জায়গা। এখানে কাজ ও পরিবার—দুটোই সামলানোর সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশি মায়েরা বলেন, জার্মানিতে শিশুদের জন্য শিক্ষা, বিনোদন ও ভাষা শেখার সুযোগ অনেক বেশি।
তবে সমাজকর্মী ও সমাজবিজ্ঞানী তিজিয়ানা দাল প্রার মতে, দেশ যাই হোক না কেন, প্রথম প্রজন্মের অনেক বাংলাদেশি নারী অভিবাসনকে নিজের সিদ্ধান্ত হিসেবে বেছে নিতে পারেন না। অনেক সময় এই যাত্রায় তারা আরও বেশি স্বাধীনতা হারান। ইউরোপে এসে তারা স্বাস্থ্য সমস্যা, সন্তান লালন ও দাম্পত্য জটিলতায় ভোগেন, কারণ তারা সমাজের চোখে প্রায় অদৃশ্য থেকে যান।
তিনি বলেন, স্বাধীনভাবে পড়াশোনা বা কাজ করতে চাইলে অনেক নারীকে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়। কমিউনিটির ভেতরে নারীর ভূমিকা আগে থেকেই নির্ধারিত—প্রথমে পরিবারের নিয়ন্ত্রণে, পরে স্বামীর অধীনে।
তবে তিজিয়ানা আশাবাদী। তার মতে, দ্বিতীয় প্রজন্মের মেয়েরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তারা অনেক সময় নিয়ম ভেঙেই নিজেদের মতো করে বাঁচতে চায়। তবে তাদের পাশে থাকতে প্রয়োজন খোলা ও বহুমাত্রিক সংলাপের জায়গা।
লিন্থা নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়ার কারণেই অনেক সময় তাকে বিচার করা হয়েছে। স্কুলে গায়ের রং বা পরিচয়ের জন্য বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে। এ কারণেই তিনি মনে করেন, অন্তর্ভুক্তি একতরফা হতে পারে না; এটি পারস্পরিক প্রক্রিয়া।
গবেষক কাটিউশিয়া কার্না দ্বিতীয় প্রজন্মের মেয়েদের জীবনধারা নিয়ে গবেষণা করে দেখেছেন, তারা সবসময় দুই জগতের মধ্যে চলাচল করে। একদিকে রয়েছে শিকড়ের টান ও স্মৃতি, অন্যদিকে নতুন সমাজের দ্রুত গতির জীবন। এই দুইয়ের মধ্যেই তারা নিজেদের পরিচয় গড়ে তোলে—একটি না হারিয়ে আরেকটিকে ধারণ করার চেষ্টা করে।


আপনার মতামত লিখুন :