ঢাকা সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২৬, ২ চৈত্র ১৪৩২
Daily Global News
(আল-জাজিরায় প্রকাশিত ব্রায়ান ওসগুডের প্রতিবেদন অবলম্বনে)

ইরান যুদ্ধ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা: ট্রাম্প প্রশাসনের নজিরবিহীন হুঁশিয়ারি

ওমর ফারুক

প্রকাশিত: মার্চ ১৬, ২০২৬, ১১:৩৪ এএম

ইরান যুদ্ধ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা: ট্রাম্প প্রশাসনের নজিরবিহীন হুঁশিয়ারি

ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হওয়া যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এবং সংবাদমাধ্যমগুলোর মধ্যে উত্তেজনা এখন তুঙ্গে। ট্রাম্প প্রশাসন স্পষ্টভাবে হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, সরকারের যুদ্ধনীতির সমালোচনামূলক খবর প্রকাশ করলে সংবাদমাধ্যমগুলোর সম্প্রচার লাইসেন্স বাতিল করা হতে পারে। আল-জাজিরায় সাংবাদিক ব্রায়ান ওসগুডের এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কীভাবে আধুনিক গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী দেশটিতে স্বাধীন সাংবাদিকতার টুঁটি চেপে ধরার চেষ্টা চলছে।

ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশনের (এফসিসি) চেয়ারম্যান ব্রেন্ডন কার গত শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে সংবাদমাধ্যমগুলোকে চূড়ান্ত সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন, সম্প্রচারকারীদের অবশ্যই ‘জনস্বার্থে’ কাজ করতে হবে, অন্যথায় তাদের লাইসেন্স নবায়নের আগেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কারের মতে, যেসব সংবাদমাধ্যম যুদ্ধের বিষয়ে ‘ধোঁকাবাজি’ এবং ‘ফেক নিউজ’ প্রচার করছে, তাদের সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘জনস্বার্থ’ বলতে কার আসলে ট্রাম্প প্রশাসনের গুণগান গাওয়াকেই বুঝিয়েছেন। এর আগে তিনি এবিসি চ্যানেলকে কৌতুক অভিনেতা জিমি কিমেলের শো বন্ধ করতে বাধ্য করেছিলেন, যা গণমাধ্যমের ওপর প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের একটি নগ্ন উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

ব্রেন্ডন কারের এই বক্তব্যকে ‘অসাংবিধানিক সেন্সরশিপ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন মার্কিন রাজনীতিবিদেরা। হাওয়াইয়ের সিনেটর ব্রায়ান শাটজ তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে লিখেছেন, “এটি গণমাধ্যমকে দেওয়া একটি পরিষ্কার নির্দেশ হয় যুদ্ধের ভালো খবর দেখাও, না হলে লাইসেন্স হারাবে।”

ফাউন্ডেশন অব ইন্ডিভিজুয়াল রাইটস অ্যান্ড এক্সপ্রেশন (ফায়ার)-এর পরিচালক অ্যারন টের বলেন, “মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনী অনুযায়ী সরকার নিজের চালানো যুদ্ধ সম্পর্কে কোনো তথ্য সেন্সর করতে পারে না। এটি জনগণের জানার অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ।”

সম্প্রতি সৌদি আরবে ইরানি হামলায় আমেরিকার তেলের বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর প্রকাশ করায় গণমাধ্যমের ওপর চটেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি তার ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফর্মে দাবি করেছেন, বিমানগুলোর কোনো ক্ষতি হয়নি এবং গণমাধ্যমগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলছে যাতে আমেরিকা যুদ্ধে হেরে যায়।

অথচ বাস্তব চিত্র এবং জনমত জরিপ ভিন্ন কথা বলছে। কুইনিপিয়াকের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, ৫৩ শতাংশ মার্কিন ভোটার ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের বিরোধী। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা এই যুদ্ধকে ‘বিনা উস্কানিতে আক্রমণ’ হিসেবে অভিহিত করে একে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলছেন। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে থাকা এবং মার্কিন বাহিনীর ওপর ক্রমাগত হামলা সত্ত্বেও ট্রাম্প কেনটাকিতে এক সমাবেশে দাবি করেছেন, “আমরা জিতেছি। প্রথম ঘণ্টাতেই সব শেষ হয়ে গিয়েছিল।”

ট্রাম্পের প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ সাংবাদিকদের ‘দেশপ্রেমিক’ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, মিডিয়ার উচিত যুদ্ধের ইতিবাচক শিরোনাম লেখা। সিএনএন-এর একটি প্রতিবেদনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যমের উচিত ছিল লেখা ‘ইরান ক্রমেই দিশেহারা হয়ে পড়ছে’। হেগসেথ এমনকি সিএনএন-এর মালিকানা ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র ডেভিড এলিসনের হাতে যাওয়ারও ইঙ্গিত দেন, যা সংবাদমাধ্যমের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

ইরান যুদ্ধের এই সংকটময় মুহূর্তে ট্রাম্প প্রশাসনের এমন অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ঐতিহ্যের ওপর এক বড় আঘাত। যুদ্ধের সত্যতা আড়াল করে কেবল সরকারের অনুকূলে সংবাদ প্রচারের এই চাপ বিশ্বজুড়ে স্বাধীন সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!